আইন, সমাজ ও সহিংসতার মাঝে: বাংলাদেশের সমকামীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

Share

 

বাংলাদেশে সমকামী মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গেলে আবেগের আগে তথ্য দেখতে হয়—আইন কী বলে, রাষ্ট্র কী করে, আর বাস্তবে কী ঘটে।

আইনের দিক থেকে শুরু করা যাক।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী “স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক” অপরাধ। এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। যদিও এই ধারা খুব কম ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এর অস্তিত্বই সমকামী মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে রাখে। কারণ এই আইন থাকায় তারা সহজেই ব্ল্যাকমেইল, পুলিশি হয়রানি এবং সামাজিক নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই অভিযোগ করতেও সাহস পান না, কারণ অভিযোগ করলেই নিজের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।

সহিংসতার বাস্তব নজিরও আছে।
২০১৬ সালে ঢাকায় সমকামী অধিকারকর্মী ও একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মতপ্রকাশ ও যৌন পরিচয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই ঘটনার পর বাংলাদেশে প্রকাশ্য এলজিবিটি অধিকারকর্মী কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে আত্মগোপনে যান, কেউ কেউ দেশ ছাড়েন। এটি প্রমাণ করে, প্রকাশ্যে নিজের পরিচয় প্রকাশ করা জীবনঝুঁকির কারণ হতে পারে।

রাষ্ট্রীয় অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সরকার এখনো সমকামী সম্পর্ককে আইনি স্বীকৃতি দেয় না এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে একাধিকবার জানিয়েছে, এটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই এটিকে সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে অবস্থান নেয়। এতে সমকামী মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকেও সুরক্ষার বার্তা পায় না।

সামাজিক বাস্তবতা আরও কঠোর।
বিভিন্ন সামাজিক গবেষণা ও এনজিও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার সমকামিতাকে রোগ, পাপ বা বিদেশি প্রভাব হিসেবে দেখে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে—

  • পরিবার থেকে বের করে দেওয়া
  • জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া
  • মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন
    এই ঘটনাগুলো ঘটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা রিপোর্ট হয় না। কারণ অভিযোগ করলে পরিবার ও সমাজে বিপদ বাড়ে।

মানসিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও উপেক্ষা করার মতো নয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, এলজিবিটি মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশেও এনজিও পর্যায়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পরিচয় গোপন রাখার চাপ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। অনেকেই চিকিৎসা নিতে ভয় পায়, কারণ সেখানে গিয়েও বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই সব তথ্য একসাথে রাখলে প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হয়।

আইনের চোখে: তারা সুরক্ষিত নয়।
রাষ্ট্রের অবস্থানে: তারা স্বীকৃত নয়।
সমাজে: তারা গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রকাশ্যে পরিচয়ের ক্ষেত্রে: তারা ঝুঁকির মধ্যে।

তারা নিরাপদ থাকে কেবল তখনই, যখন তারা অদৃশ্য থাকে। যখন তারা নিজের পরিচয় গোপন করে চলে। কিন্তু এটাকে নিরাপত্তা বলা যায় না। এটাকে বলা যায় সীমাবদ্ধ অস্তিত্ব।

অনেকে বলেন, এটি “পশ্চিমা সংস্কৃতি”। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সংস্কৃতির নয়, নাগরিক অধিকারের। সংবিধান বলছে, সব নাগরিক আইনের চোখে সমান। অথচ বাস্তবে এক শ্রেণির মানুষকে বলা হচ্ছে—তোমার পরিচয় নিয়ে কথা বলা যাবে না।

সমস্যা সমকামিতা নয়।
সমস্যা হলো আইন, রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক মানসিকতা একসাথে মিলে একটি জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে দিয়েছে।

এই অবস্থায় প্রশ্নটা আর ব্যক্তিগত নৈতিকতার নয়। প্রশ্নটা রাষ্ট্রের দায়িত্বের।
একজন নাগরিক যদি শুধু নিজের পরিচয়ের জন্য নিরাপত্তাহীন হয়, তাহলে সেটা তার ব্যর্থতা নয়—সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।

বাংলাদেশে সমকামীরা নিরাপদ কি না—এই প্রশ্নের উত্তর তথ্যভিত্তিকভাবে এখনো একটাই:
না।