খুনকে ধর্ম বানানো: মৌলবাদী বর্বরতা ও রাষ্ট্রের কাপুরুষতা

Share

একজন সমকামীকে হত্যা করে কেউ যখন বলে, “আমরা নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছি”—তখন এটা আর অপরাধ থাকে না, এটা হয়ে যায় রাজনৈতিক ঘোষণা। এই ঘোষণার মানে একটাই:
আমরা মানুষ মারাকে বৈধ মনে করি

প্রশ্ন হলো—মৌলবাদীরা কেন সমকামীদের হত্যা করাকে বৈধ মনে করে?

কারণ তারা প্রথমেই মানুষটাকে মানুষ হিসেবে মানে না।
তাদের ভাষায় সমকামী আর নাগরিক না,
সে হয়ে যায়—
“পাপী”,
“বিকৃত”,
“শত্রু”,
“ধর্মদ্রোহী”।

এই শব্দগুলো কোনো গালি না, এগুলো খুনের প্রস্তুতি।
কারণ যতক্ষণ কাউকে মানুষ বলা হয়, ততক্ষণ তাকে মারতে বিবেক লাগে।
আর মানুষ বলা বন্ধ হলেই
খুন সহজ হয়ে যায়।

এরপর আসে ধর্মের বিকৃতি।
ধর্মের দয়া, ক্ষমা, সহানুভূতি—এই অংশ বাদ দিয়ে
শুধু শাস্তির কথা তুলে আনা হয়।
আর সেই শাস্তির ব্যাখ্যা দেয় নিজেরা।

কোন আদালত তাদের এই শাস্তি দেওয়ার অধিকার দিয়েছে?
কোন আইন?
কোন সংবিধান?

উত্তর—কোনোটাই না।
তারা নিজেরাই বিচারক, নিজেরাই জল্লাদ।

এই মানসিকতা নতুন নয়।
ইতিহাস বলে—যেখানে মৌলবাদ শক্ত হয়,
সেখানে আগে ভাষা বদলায়,
তারপর আইন,
তারপর মানুষ।

আগে বলা হয়—“ওরা মানুষ না।”
তারপর বলা হয়—“ওদের মারলে পাপ নেই।”
শেষে বলা হয়—“ওদের মারা দায়িত্ব।”

এভাবেই খুন “ধর্মীয় দায়িত্ব” হয়ে ওঠে।

২০১৬ সালে ঢাকায় সমকামী অধিকারকর্মী ও একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
হত্যার পর হত্যাকারীরা পালিয়ে গিয়েছিল এই বিশ্বাস নিয়ে—
তারা অপরাধ করেনি, তারা শাস্তি দিয়েছে।

এইটাই মৌলবাদী মানসিকতার চেহারা—
আইনকে বাতিল করে
নিজেকে ঈশ্বর বানানো।

এখন প্রশ্ন আসে—
রাষ্ট্র তখন কোথায় ছিল?

রাষ্ট্র চুপ ছিল।
চুপ মানে নিরপেক্ষ না।
চুপ মানে দাঁড়িয়ে দেখা।

রাষ্ট্র শক্ত করে বলেছিল কি—
“এই হত্যাকাণ্ড ঘৃণ্য অপরাধ”?
বলেছিল কি—
“এই মতাদর্শের কোনো বৈধতা নেই”?

না।

এই নীরবতাই মৌলবাদীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কারণ তারা বুঝে যায়—
খুন করলে সমাজ কাঁপবে,
কিন্তু রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না।

রাষ্ট্র কেন চুপ?

কারণ রাষ্ট্র ভয় পায়।
মৌলবাদীরা রাস্তায় নামতে পারে।
মৌলবাদীরা হুমকি দিতে পারে।
রাজনৈতিকভাবে তারা অস্বস্তিকর।

তাই রাষ্ট্র হিসাব করে—
“এই ইস্যুতে শক্ত হলে ভোট যাবে।”
এই ভোটের হিসাবই
মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে যায়।

এইখানেই রাষ্ট্র অপরাধে অংশীদার হয়।

যে রাষ্ট্র বলে না—
“সমকামী নাগরিকও নাগরিক”,
সে রাষ্ট্র আসলে বলে—
“ওদের মরলে সমস্যা নেই।”

এই নীরবতার ভেতর দিয়েই
খুন বৈধতার ভাষা পায়।

মৌলবাদীরা বলে—
“ওরা সমাজ নষ্ট করছে।”
কিন্তু সত্য হলো—
ওরা নিজেরাই সমাজকে খুনে পরিণত করছে।

সমকামী মানুষ রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়।
হুমকি হলো এমন আদর্শ,
যে মানুষ মারাকে নৈতিক বলে।

আজ সমকামী,
কাল লেখক,
পরশু শিক্ষক,
তারপর যে কেউ।

কারণ একবার যদি খুনকে নৈতিক বানানো যায়,
তাহলে কারো জীবনই আর নিরাপদ থাকে না।

এই জায়গায় এসে প্রশ্নটা ধর্মের না।
প্রশ্নটা রাষ্ট্রের।

রাষ্ট্র কি মানুষের পক্ষে থাকবে?
নাকি খুনের পক্ষে নীরব থাকবে?

রাষ্ট্র যদি বলে—
“এটা সংবেদনশীল বিষয়”,
মানে সে আসলে বলছে—
“তোমার জীবন সংবেদনশীল না।”

এই অবস্থান কোনো দুর্ঘটনা না।
এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

মৌলবাদীরা সমকামীদের হত্যা বৈধ মনে করে
কারণ সমাজের একাংশ চুপ থাকে
আর রাষ্ট্র দ্বিধায় থাকে।

এই দুইটা থাকলেই
খুনের সাহস বাড়ে।

সমাধান কী?

স্পষ্ট অবস্থান।
অর্ধেক কথা না।
কূটনৈতিক ভাষা না।

রাষ্ট্রকে বলতে হবে—
“সমকামী নাগরিককে হত্যা মানে হত্যা।”
“এর কোনো ধর্মীয় বৈধতা নেই।”
“এর কোনো নৈতিকতা নেই।”

আর সমাজকে বলতে হবে—
“ধর্মের নামে মানুষ মারাকে আমরা মানব না।”

কারণ যে সমাজ খুনের ভাষা মেনে নেয়,
সে সমাজ একদিন
নিজেই খুনের তালিকায় উঠে আসে।

আজ সমকামী,
কাল তুমি।

এই সত্যটা যতদিন আমরা অস্বীকার করব,
ততদিন খুনকে কেউ না কেউ
“দায়িত্ব” বলে চালিয়ে যাবে।

আর রাষ্ট্র যদি তখনও চুপ থাকে,
তাহলে সে আর রাষ্ট্র থাকে না,
সে হয়ে যায়
নীরব দর্শক—
একটা রক্তাক্ত মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক।

আর ইতিহাসে
নীরব দর্শকদের নাম
কখনো ভালোভাবে লেখা হয় না।