নাচ–গান করা মানুষ কেন মৌলবাদীদের চোখে “বাইরের লোক”?

Share

 

 

নাচ, গান, নাটক—এসব এই অঞ্চলের সংস্কৃতির ভেতরেই জন্মেছে। বাউল, মরমি গান, পালাগান, জারি–সারি, ভাটিয়ালি—সবই তো এই সমাজেরই সন্তান। তবু একশ্রেণির মৌলবাদী চিন্তায় নাচ–গান করা মানুষ “বিপথগামী”, “অশালীন”, “অপর সংস্কৃতির দালাল” হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এই ঘৃণার উৎস কোথায়?

এটা শুধু ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিষয় না। এটা ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ আর ভয়-এর রাজনীতি।

প্রথমত, শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন
নাচ মানে শরীরের প্রকাশ। গান মানে কণ্ঠের প্রকাশ। মৌলবাদী চিন্তায় শরীর সন্দেহজনক বস্তু। শরীর আনন্দ করলে, স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করলে, তা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আর যেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেটাই তাদের কাছে বিপজ্জনক।
এই কারণে তারা শুধু গান বা নাচ নয়, হাসি, পোশাক, চুলের ধরন—সবকিছুর ওপর নিয়ম বসাতে চায়। কারণ শরীর নিয়ন্ত্রণ করা মানেই মানুষ নিয়ন্ত্রণ করা।

দ্বিতীয়ত, নৈতিকতার একচ্ছত্র মালিকানা
মৌলবাদী মানসিকতায় নৈতিকতা বহুবিধ হতে পারে না। তাদের ব্যাখ্যাই একমাত্র সত্য। ফলে নাচ–গান তাদের চোখে শিল্প না, “নৈতিক বিচ্যুতি”।
এখানে সমস্যাটা নাচে না, সমস্যাটা হলো—কে ঠিক করবে কী ঠিক আর কী ভুল।
যখন তারা বলে, “নাচ হারাম” বা “গান চরিত্র নষ্ট করে”, তখন আসলে তারা বলছে, “নৈতিকতার মালিক আমরা।”

তৃতীয়ত, নারীর শরীর নিয়ে রাজনীতি
নাচ–গানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ যায় নারীর ওপর। কারণ নারী যখন নাচে বা গান করে, সে প্রকাশ্যে আসে। সে নিজের শরীর ও কণ্ঠকে নিজের মতো করে ব্যবহার করে।
মৌলবাদী মানসিকতায় নারী মানে ঘরের ভেতরের বস্তু, লুকিয়ে রাখা সম্পদ। ফলে নাচ–গান করা নারী তাদের চোখে দ্বিগুণ অপরাধী—
সে প্রকাশ্যে আছে,
আর সে আনন্দ করছে।
এই দুইটাই তাদের কাছে ভয়ংকর।

চতুর্থত, শিল্প মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়
গান শুধু বিনোদন না, অনেক সময় প্রতিবাদ।
নাটক শুধু গল্প না, অনেক সময় রাজনীতি।
নাচ শুধু শরীর না, অনেক সময় পরিচয়ের ভাষা।

শিল্প মানুষকে শেখায়—সব নিয়ম চূড়ান্ত না, সব ভয় সত্য না।
মৌলবাদী চিন্তা এই প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না। তারা চায় আনুগত্য, ভাবনা নয়। তাই শিল্প তাদের কাছে সন্দেহজনক। কারণ শিল্প মানে ভাবার ক্ষমতা।

পঞ্চমত, আমরা বনাম তারা” বানানোর রাজনীতি
মৌলবাদ শক্তি পায় বিভাজন থেকে। তারা সমাজকে ভাগ করে—
আমরা পবিত্র,
ওরা অপবিত্র।
আমরা ঠিক,
ওরা ভুল।

নাচ–গান করা মানুষকে “বাইরের লোক” বানালে এই বিভাজন সহজ হয়। তখন বলা যায়, “ওরা আমাদের মতো না।”
এই “ওরা” বানানোই মৌলবাদের জ্বালানি।

ষষ্ঠত, আনন্দের প্রতি ভয়
নাচ–গান মানে আনন্দ, মিলন, উৎসব।
আর মৌলবাদী রাজনীতির ভিত্তি ভয়—
পাপের ভয়,
শাস্তির ভয়,
অপরের ভয়।

যেখানে মানুষ একসঙ্গে গান গায়, নাচে, হাসে—সেখানে ভয় ধরে রাখা কঠিন।
সেই কারণেই আনন্দকে সন্দেহ করা হয়। কারণ আনন্দ মানুষকে কম নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলে।

আসল কথা হলো, মৌলবাদীদের সমস্যা নাচ–গান না।
তাদের সমস্যা হলো—মানুষ যদি নিজের মতো করে বাঁচে।

নাচ–গান করা মানুষ তাদের চোখে “বাইরের” কারণ তারা দেখিয়ে দেয়, জীবন শুধু নিয়ম আর নিষেধে সীমাবদ্ধ না।
জীবন মানে অনুভূতি, শরীর, প্রশ্ন, কণ্ঠ।

এই দেশে নাচ–গান নতুন কিছু না।
নতুন হলো—এই আনন্দকে শত্রু বানানোর রাজনীতি।

সমস্যা সংস্কৃতিতে না।
সমস্যা হলো—কে মানুষের জীবনযাপন ঠিক করবে।

আর যে শক্তি মানুষের হাসিকে অপরাধ মনে করে,
সে শক্তি আসলে মানুষকেই ভয় পায়।

কারণ যেখানে মানুষ নিজের মতো করে বাঁচে,
সেখানে মৌলবাদ টিকে থাকতে পারে না।