মৌলবাদীদের সমস্যা নাচ না।
মৌলবাদীদের সমস্যা গান না।
মৌলবাদীদের সমস্যা হলো—মানুষ যদি ভয় ছাড়া বাঁচে।
এই দেশে নাচ–গান নতুন কিছু না। লালন ছিল, হাসন রাজা ছিল, ভাটিয়ালি ছিল, জারি ছিল, সারি ছিল। শত শত বছর ধরে মানুষ গেয়েছে, নেচেছে, উৎসব করেছে। কিন্তু মৌলবাদী রাজনীতিতে এসব হঠাৎ “অশ্লীল”, “বিপথগামী”, “ইসলামবিরোধী” হয়ে গেল। প্রশ্ন হলো—হঠাৎ করে কার এত কষ্ট শুরু হলো?
কারণ মৌলবাদ টিকে থাকে ভয়ের ওপর।
পাপের ভয়,
শাস্তির ভয়,
নারীর ভয়,
শরীরের ভয়,
আনন্দের ভয়।
নাচ মানে শরীরের স্বাধীনতা।
গান মানে কণ্ঠের স্বাধীনতা।
আর স্বাধীন শরীর আর স্বাধীন কণ্ঠ—এই দুইটাই মৌলবাদীর সবচেয়ে বড় দুশমন।
মৌলবাদ চায় মানুষ যেন নিচু চোখে চলে, চুপ করে থাকে, প্রশ্ন না করে।
নাচ–গান করা মানুষ তা করে না। সে প্রকাশ্যে দাঁড়ায়, হাসে, কণ্ঠ তোলে।
এই কারণেই নাচ–গান করা মানুষ মৌলবাদীদের কাছে “বাইরের লোক”।
মৌলবাদীরা নৈতিকতার মালিকানা দখল করতে চায়।
তাদের কথা না মানলেই তুমি “বেঈমান”, “নষ্ট”, “পথভ্রষ্ট”।
তাদের জামা-কাপড় না পরলেই তুমি “পশ্চিমা দালাল”।
তাদের মতো না চললেই তুমি “শত্রু সংস্কৃতি”।
এইটা ধর্ম না।
এইটা ক্ষমতার ব্যবসা।
সবচেয়ে বেশি আঘাতটা পড়ে নারীর ওপর।
নারী নাচলে সমস্যা,
নারী গাইলে সমস্যা,
নারী হাসলে সমস্যা,
নারী মঞ্চে দাঁড়ালেই সমস্যা।
কারণ মৌলবাদী চিন্তায় নারী মানুষ না, সম্পত্তি।
যে সম্পত্তি ঘরের বাইরে যাবে না, কণ্ঠ তুলবে না, শরীর দেখাবে না।
নারী যখন নাচে, তখন সে ঘোষণা দেয়—
“এই শরীর আমার।”
এই ঘোষণাই মৌলবাদীদের গায়ে আগুন লাগায়।
আর তারা বলে—“সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছে।”
আসলে নষ্ট হচ্ছে তাদের দখলদারি।
নাচ–গান নিষিদ্ধ করার রাজনীতি আসলে একটাই কথা বলে—
“তোমার জীবন আমি চালাব।”
তুমি কী পরবে,
তুমি কী শুনবে,
তুমি কীভাবে হাসবে—সব আমি ঠিক করব।
এটাই মৌলবাদ।
আর শিল্প সব সময় এই নিয়ন্ত্রণ ভাঙে।
গান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়।
নাটক মানুষকে ভাবতে শেখায়।
নাচ মানুষকে নিজের শরীর চিনতে শেখায়।
তাই মৌলবাদ শিল্পকে ভয় পায়।
কারণ যে মানুষ ভাবতে শেখে, সে ফতোয়া মানে না।
যে মানুষ হাসতে শেখে, সে ভয় মানে না।
আরেকটা বড় কারণ আছে—
মৌলবাদী রাজনীতিতে দরকার “আমরা” আর “ওরা”।
আমরা পবিত্র,
ওরা অপবিত্র।
আমরা ঠিক,
ওরা ভুল।
নাচ–গান করা মানুষকে “বাইরের” বানানো এই বিভাজনের সবচেয়ে সহজ উপায়।
তখন বলা যায়—
“ওরা আমাদের না।”
“ওরা নষ্ট।”
“ওরা পশ্চিমা।”
এই “ওরা” বানানোর রাজনীতিতেই মৌলবাদ বেঁচে থাকে।
এই দেশে সমস্যা নাচ–গান না।
সমস্যা হলো—কে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে।
আর যে শক্তি মানুষের হাসিকে অপরাধ বানায়,
সে শক্তি আসলে মানুষের শত্রু।
কারণ যেখানে গান থাকে, সেখানে ভয় টেকে না।
যেখানে নাচ থাকে, সেখানে শিকল টেকে না।
যেখানে মানুষ আনন্দ করে, সেখানে মৌলবাদ টিকে থাকতে পারে না।
এই জন্যই তারা গানকে ঘৃণা করে।
এই জন্যই তারা নাচকে ঘৃণা করে।
এই জন্যই তারা শিল্পীকে ঘৃণা করে।
কারণ শিল্প মানে স্বাধীনতা।
আর মৌলবাদ মানে শাসন।
এই লড়াই নাচ–গানের না।
এই লড়াই মানুষের জীবন কে চালাবে—এই প্রশ্নের।
আর যারা বলে, “নাচ–গান হারাম”,
তারা আসলে বলে—
“তুমি স্বাধীন হতে পারবে না।”
এটাই তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ।