এই দেশে নারীর স্বাধীনতা আছে—এই কথাটা আজকাল রসিকতার মতো শোনায়। বাস্তবে যা আছে, তা হলো অনুমতি নিয়ে বাঁচার অধিকার। পড়তে পারবে, যদি কেউ বাধা না দেয়। বেরোতে পারবে, যদি কেউ রাগ না করে। কথা বলতে পারবে, যদি কেউ অপমান না করে।
আর এই “যদি”-গুলোর মালিক হলো মৌলবাদী মানসিকতা।
মৌলবাদীরা নারীকে বন্দি করতে চায় কেন?
কারণ স্বাধীন নারী তাদের শত্রু।
স্বাধীন নারী মানে এমন একজন মানুষ, যে প্রশ্ন করে।
স্বাধীন নারী মানে এমন একজন মানুষ, যে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বাধীন নারী মানে এমন একজন মানুষ, যার শরীর আর জীবন তার নিজের।
এই তিনটা জিনিসই মৌলবাদী চিন্তার জন্য বিপজ্জনক। কারণ মৌলবাদ টিকে থাকে আদেশ আর ভয়ের ওপর। সেখানে পুরুষ হবে পাহারাদার, নারী হবে সম্পত্তি। এই কাঠামো ভাঙলেই তাদের দাপট শেষ।
তাদের কাছে নারী মানুষ না, প্রতীক।
কখনো “ইজ্জত”,
কখনো “নৈতিকতা”,
কখনো “সংস্কৃতি”।
মানে, নারী নিজে কিছু না।
তার শরীর দিয়ে সমাজের চরিত্র মাপা হয়।
তার চলাফেরা দিয়ে ধর্মের অবস্থা বোঝানো হয়।
এই জন্যই মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিয়ে হুমকি আসে।
এই জন্যই পোশাক নিয়ে ফতোয়া ঝরে।
এই জন্যই বলা হয়—রাতে বের হলে চরিত্র যাবে।
রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে, কাজ না থাকলে, দুর্নীতি বাড়লে—
মৌলবাদীরা দোষ দেয় নারীর হাঁটাচলায়।
যেন অর্থনীতি ধ্বংস করেছে মেয়েদের জিন্স।
যেন রাজনীতি নষ্ট হয়েছে নারীর হাসিতে।
এইটাই তাদের সবচেয়ে নোংরা কৌশল—
নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে নারীর শরীরকে শত্রু বানানো।
আরেকটা ভয় তাদের—পরিবার বদলে যাবে।
নারী যদি নিজের সঙ্গী বেছে নেয়,
নিজের আয় নিজে নিয়ন্ত্রণ করে,
নিজের শরীরের মালিক হয়—
তাহলে বিয়ে আর উত্তরাধিকার আর পুরুষের কর্তৃত্ব টিকবে কীভাবে?
এই প্রশ্নটাই তাদের ঘুম হারাম করে।
তাই তারা তালা লাগায়—
পোশাকে তালা,
শিক্ষায় তালা,
চলাফেরায় তালা,
স্বপ্নে তালা।
তারপর বলে—“আমরা নারীকে রক্ষা করছি।”
রক্ষা কিসের থেকে?
নারীর নিজের জীবন থেকে?
এই দেশে পুরুষ ভুল করলে সেটা “স্বাভাবিক”।
নারী ভুল করলে সেটা “চরিত্র”।
পুরুষ প্রেম করলে সাহসী।
নারী প্রেম করলে নষ্ট।
এই দ্বিচারিতাই প্রমাণ করে—
সমস্যা নৈতিকতা না,
সমস্যা নিয়ন্ত্রণ।
মৌলবাদীরা নারীকে বন্দি চায়,
কারণ বন্দি নারী ভোট চাইবে না,
বন্দি নারী চাকরি চাইবে না,
বন্দি নারী নিজের শরীরের মালিকানা চাইবে না।
বন্দি নারী নিরাপদ না—
বন্দি নারী সুবিধাজনক।
এটা ধর্ম না।
এটা সংস্কৃতি না।
এটা খাঁটি ক্ষমতার রাজনীতি।
সমস্যা নারী না।
সমস্যা হলো—একদল মানুষ এখনো ভাবে,
কে পড়বে,
কে বের হবে,
কে ভালোবাসবে—
এগুলো তারা ঠিক করে দেবে।
যে সমাজ নারীর স্বাধীনতাকে ভয় পায়,
সে সমাজ আসলে নিজের দুর্বলতাকেই ঢাকতে চায়।
আর যে সমাজ নারীকে শিকলে বাঁধে,
সে সমাজ একদিন নিজেই হাঁটতে ভুলে যায়।
প্রশ্নটা তাই বদলাতে হবে—
নারীর কি স্বাধীনতা আছে?
না।
প্রশ্নটা হলো—
আমরা কবে নারীকে মানুষ হিসেবে মানতে শিখব?
যেদিন শিখব,
সেদিনই মৌলবাদীদের রাজনীতি ভেঙে পড়বে।