কাগজে-কলমে নারীর স্বাধীনতা আছে। সংবিধানে সমানাধিকার আছে। আইনেও কিছু সুরক্ষা আছে। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্নটা অন্যরকম—
একজন নারী কি নিজের পোশাক, পড়াশোনা, চলাফেরা, প্রেম, পেশা নিজের মতো করে ঠিক করতে পারে?
উত্তরটা বেশিরভাগ সময় হয়: সীমিতভাবে। শর্তসাপেক্ষে। অনুমতির ভেতরে।
মৌলবাদীরা নারীকে বন্দি করতে চায় কেন, সেটা বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে—তারা কিসের ভয় পায়।
প্রথমত, তারা ভয় পায় স্বাধীন নারীর।
স্বাধীন নারী প্রশ্ন করে।
স্বাধীন নারী সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বাধীন নারী বলে, “আমার জীবন আমার।”
এই কথাটা মৌলবাদী চিন্তার জন্য বিপজ্জনক। কারণ মৌলবাদ টিকে থাকে আদেশ আর আনুগত্যের ওপর। সেখানে পুরুষ হবে নিয়ন্ত্রক, নারী হবে নিয়ন্ত্রিত। এই ছক ভেঙে গেলে পুরো ক্ষমতার কাঠামো নড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, তারা নারীকে দেখে সম্মানের বোঝা হিসেবে, মানুষ হিসেবে নয়।
তাদের ভাষায় নারীর শরীর মানে পরিবারের মান-সম্মান।
নারীর চলাফেরা মানে সমাজের নৈতিকতা।
নারীর পোশাক মানে ধর্মের অবস্থা।
মানে, নারীর জীবন নারীর না।
ওটা হয়ে যায় পরিবার, সমাজ আর ধর্মের সম্পত্তি।
এই কারণেই মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিয়ে ফতোয়া হয়।
এই কারণেই পোশাক নিয়ে হুমকি আসে।
এই কারণেই বলা হয়—বের হলে বিপদ, কথা বললে পাপ, সিদ্ধান্ত নিলে চরিত্র নষ্ট।
তৃতীয়ত, মৌলবাদীদের রাজনীতি চলে ভয়ের ওপর।
যখন বেকারত্ব, দুর্নীতি, বৈষম্য বাড়ে,
তখন তারা বলে—“নারী বেশি স্বাধীন হয়ে গেছে।”
যেন রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায় নারীর পোশাকে।
এটা খুব পুরোনো কৌশল।
সমস্যার আসল জায়গায় না গিয়ে,
নারীর শরীরকে শত্রু বানানো।
চতুর্থত, তারা বিশ্বাস করে সমাজ টিকবে নিয়ন্ত্রিত যৌনতার ওপর।
নারী যদি নিজের ভালোবাসা নিজে বেছে নেয়,
নিজের শরীরের মালিক নিজে হয়,
তাহলে বিয়ে, উত্তরাধিকার, পারিবারিক কর্তৃত্ব—সব প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই প্রশ্ন তারা চায় না।
তাই তারা দেয় তালা—
পোশাকে তালা,
শিক্ষায় তালা,
চলাফেরায় তালা,
স্বপ্নেও তালা।
নারীদের কি কোনো স্বাধীনতা নেই?
আছে।
কিন্তু সেই স্বাধীনতা বারবার প্রমাণ করতে হয়।
পোশাক পরলে প্রমাণ করতে হয়।
রাতে বের হলে প্রমাণ করতে হয়।
কাজ করলে প্রমাণ করতে হয়।
ভুল করলে শাস্তি হয়,
আর পুরুষের ভুল “স্বাভাবিক” হয়ে যায়।
এটাই অসমতার বাস্তব চিত্র।
মৌলবাদীরা নারীকে বন্দি করতে চায়,
কারণ বন্দি নারী প্রশ্ন করে না।
বন্দি নারী বিদ্রোহ করে না।
বন্দি নারী নিজের জীবন নিজের বলে দাবি করে না।
কিন্তু ইতিহাস বলে, নারীকে চিরদিন বন্দি রাখা যায় না।
মেয়েরা পড়ছে, কাজ করছে, কথা বলছে।
আর এই কথাবলার শব্দটাই মৌলবাদীদের সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করে।
সমস্যা নারী না।
সমস্যা স্বাধীনতা।
যে সমাজ বলে,
“তুমি যেমন, সেটা লুকাও,”
সে সমাজ আসলে বলে,
“তুমি মানুষ নও, তুমি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বস্তু।”
আর যে সমাজ নারীর স্বাধীনতাকে ভয় পায়,
সে সমাজ আসলে নিজের দুর্বলতাই প্রকাশ করে।
প্রশ্নটা তাই বদলে যায়—
নারীদের কি স্বাধীনতা নেই?
না।