নীরব রাষ্ট্র, খোলা রক্তপাত

Share

 

যখন কোনো মানুষ তার পরিচয়ের কারণে হত্যা হয়, তখন সেটা আর শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ থাকে না। সেটা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন। কারণ নাগরিকের জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে সমকামী মানুষের হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রের আচরণ দেখে মনে হয়, এই দায়িত্ব সবার জন্য সমান নয়।

সমকামীদের ওপর সহিংসতা নতুন কিছু না। বহু বছর ধরে তারা হুমকি, অপমান, ব্ল্যাকমেইল, সামাজিক বয়কটের শিকার। এগুলোর শেষ ধাপ হচ্ছে হত্যা। আর প্রতিবার হত্যার পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রায় একই—কিছু আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, “তদন্ত চলছে” ধরনের বাক্য, তারপর দীর্ঘ নীরবতা।

২০১৬ সালে জুলহাজ মান্নান ও তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তারা কোনো অপরাধ করেনি। তারা শুধু এমন মানুষের কথা বলেছিল, যাদের কথা সমাজ শুনতে চায় না। সেই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা—এই দেশে কিছু পরিচয় নিয়ে কথা বললে মরতে হবে। রাষ্ট্র তখন বলেছিল, বিচার হবে। কিন্তু সেই বিচার কোথায়? অপরাধীদের শাস্তি কোথায়?

এই নীরবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এটা একটি অভ্যাস।
রাষ্ট্র বারবার দেখিয়েছে—এই খুনগুলো তার অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা মানে এই না যে সরকার নিজে ছুরি চালায়। পৃষ্ঠপোষকতা আসে নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে। যখন রাষ্ট্র শক্তভাবে বলে না, “এই খুন অপরাধ”, তখন সমাজ বুঝে নেয়—এই খুন সহনীয়। সহনীয় অপরাধ বারবার ঘটে।

আইনও এই সহিংসতাকে শক্ত করে। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা এখনো সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ বানিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্র নিজেই ঘোষণা করে দিয়েছে—এই মানুষগুলো সন্দেহজনক। ফলে সমাজ সহজেই বলে, “ওরা তো আইন ভাঙে।” এই মানসিকতা খুনিকে নৈতিক ছাড় দেয়।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই দায়িত্ব নিতে চাইত, তাহলে প্রতিটি হত্যার বিচার নিশ্চিত করত। অন্তত বলত—যৌন পরিচয়ের কারণে কাউকে হত্যা করলে কঠোর শাস্তি হবে। কিন্তু রাষ্ট্র সেটা বলে না। চুপ থাকে। আর এই চুপ থাকাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।