একজন শিক্ষার্থীর কাজ কি শুধু ক্লাসে বসে নোট লেখা আর পরীক্ষায় ভালো করা?
সে কি হাসবে না, গাইবে না, নাচবে না, নাটক করবে না?
এই প্রশ্নটা আজ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। কারণ কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠীর মতে, শিক্ষার্থীর এসব করা ঠিক না। তাদের যুক্তি—এগুলো নাকি চরিত্র নষ্ট করে, ধর্ম নষ্ট করে, সমাজ নষ্ট করে। কিন্তু সত্যিই কি নাচ–গানে সমাজ নষ্ট হয়, নাকি অন্য কিছুতে তাদের সমস্যা?
নাচ–গান মানে অনুভূতির ভাষা।
মানুষ শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, মানুষের ভেতরেও জীবন থাকে।
গান সেই ভেতরের কথাটা বের করে আনে,
নাচ শরীরকে কথা বলতে দেয়।
আর এই প্রকাশটাই মৌলবাদী চিন্তার জন্য বিপজ্জনক। কারণ তারা চায়—মানুষ শিখবে, কিন্তু ভাববে না। শোনবে, কিন্তু বলবে না।
তাদের কল্পনায় আদর্শ শিক্ষার্থী মানে—
চুপচাপ থাকা,
একই রকম পোশাক পরা,
একই রকম আচরণ করা,
ভিন্ন কিছু না চাওয়া।
কিন্তু নাচ–গান মানে ভিন্নতা।
কেউ নজরুল গায়, কেউ লোকগান, কেউ আধুনিক নাচ শেখে।
এই বৈচিত্র্যই তাদের ভয়। কারণ বৈচিত্র্য মানে পছন্দের অধিকার।
আর পছন্দের অধিকার মানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া।
সবচেয়ে বেশি আপত্তি আসে মেয়েদের ক্ষেত্রে।
একজন ছাত্রী যদি মঞ্চে ওঠে,
নাচে বা গান গায়—
তখন তাকে বলা হয় “অশোভন”, “অশালীন”, “বেপর্দা”।
কারণ তাদের চোখে মেয়ের শরীর দৃশ্যমান হওয়াটাই সমস্যা।
মেয়েরা যত আড়ালে থাকবে, তত তারা নিরাপদ—এই ধারণাই সেখানে কাজ করে।
আরেকটা কারণ হলো ভয়।
নাচ–গান, নাটক, সাহিত্য—এসব মানুষের ভাবনার জগৎ বড় করে।
আর বড় ভাবনার মানুষ প্রশ্ন করে।
সে জিজ্ঞেস করে—কেন? কীভাবে? কার সিদ্ধান্তে?
এই প্রশ্নগুলো মৌলবাদী মানসিকতার জন্য বিপজ্জনক।
তাই তারা বলে—
“এটা বন্ধ করো।”
“ওটা হারাম।”
“ওটা শিক্ষার্থীর কাজ না।”
এভাবে তারা আনন্দকে অপরাধ বানায়,
আর অপরাধ বানিয়ে নিয়ন্ত্রণ চালায়।
আরও একটা বিষয় আছে—দায় চাপানোর রাজনীতি।
যখন শিক্ষার মান পড়ে,
যখন তরুণরা হতাশ হয়,
যখন সমাজে সহিংসতা বাড়ে—
তখন বলা হয়, “নাচ–গানেই সব নষ্ট হয়েছে।”
যেন সমস্যার মূল কারণ বই না পড়া নয়,
মূল কারণ গান শোনা।
এটা সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা।
কারণ এতে প্রশ্নটা ঘুরে যায়—
শিক্ষা কেন পিছাচ্ছে?
চাকরি কেন নেই?
সেই প্রশ্ন আর করতে হয় না।
কিন্তু শিক্ষা মানে শুধু তথ্য মুখস্থ করা না।
শিক্ষা মানে কল্পনা শেখা,
অনুভব শেখা,
নিজেকে প্রকাশ করা শেখা।
যে সমাজ শিক্ষার্থীদের নাচ–গান বন্ধ করতে চায়,
সে সমাজ আসলে চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হোক
নীরব,
ভীত,
একই ছাঁচে ঢালা।
প্রশ্নটা তাই বদলাতে হবে—
একজন শিক্ষার্থী কি নাচ–গান করতে পারবে না?
না।
প্রশ্নটা হলো—
আমরা কি শিক্ষার্থীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই,
নাকি শুধু পরীক্ষা পাশের যন্ত্র বানাতে চাই?
মৌলবাদীরা নাচ–গানে বাধা দেয়,
কারণ তারা ভয় পায় এমন প্রজন্মকে,
যারা গাইতে জানে,
নাচতে জানে,
আর সবচেয়ে ভয়ংকর কথা—
নিজের মতো করে ভাবতে জানে।
আর ভাবতে জানা মানুষকে
কখনো পুরোপুরি শাসন করা যায় না।