ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনা দেখলেই আমরা ভাবি—এটা বুঝি ধর্মীয় বিরোধ। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, বিষয়টা ধর্মের চেয়ে অনেক বেশি রাজনীতির, ইতিহাসের আর ক্ষমতার।
মৌলবাদীরা ভাস্কর্য ভাঙতে চায় কেন?
কারণ ভাস্কর্য শুধু শিল্প নয়, এটা গল্প বলে।
কার গল্প? মানুষের গল্প। লড়াইয়ের গল্প। প্রতিবাদের গল্প। মুক্তির গল্প।
আর এই গল্পগুলোই তাদের অস্বস্তির জায়গা।
একটা ভাস্কর্য মানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশ্ন।
কে এই মানুষ?
কেন তাকে স্মরণ করা হচ্ছে?
কীসের জন্য সে লড়েছিল?
এই প্রশ্নগুলো মানুষকে ভাবতে শেখায়।
আর ভাবতে শেখা মানুষ আদেশ মানতে চায় না।
মৌলবাদী চিন্তার জন্য এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা।
তাদের আদর্শ চায় একটাই ইতিহাস, একটাই ব্যাখ্যা, একটাই স্মৃতি।
কিন্তু ভাস্কর্য মানে বহু ব্যাখ্যা, বহু দৃষ্টিভঙ্গি।
একজন মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য কেউ দেখে সাহস পায়,
কেউ দেখে প্রশ্ন তোলে,
কেউ দেখে নিজের মতো করে ভাবতে শেখে।
এই বহুত্বই তাদের সমস্যা।
আরেকটা দিক আছে—ভাস্কর্য ধর্মের বাইরের নৈতিকতা তুলে ধরে।
একটা ভাস্কর্য বলতেই পারে—মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে,
ন্যায় অন্যায় ধর্ম ছাড়াও বোঝা যায়,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোনো গুনাহ নয়।
এই কথাগুলো মৌলবাদীদের জন্য হুমকি।
কারণ তারা চায় নৈতিকতা মানে শুধু তাদের ব্যাখ্যা করা ধর্মীয় নিয়ম।
ভাস্কর্য ভাঙা তাই নিছক শিল্পবিরোধিতা না।
এটা শক্তি প্রদর্শন।
এটা বলা—“আমাদের অনুমতি ছাড়া কিছু থাকবে না।”
যেখানে রাষ্ট্র নরম,
যেখানে সমাজ চুপ,
সেখানে ভাস্কর্য ভাঙা হয় বার্তা হিসেবে—
“আমরাই ঠিক করব, কী থাকবে আর কী থাকবে না।”
আরেকটা পুরোনো কৌশলও এখানে কাজ করে—
যখন বেকারত্ব বাড়ে,
যখন দুর্নীতি বাড়ে,
যখন মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে—
তখন সামনে আনা হয় ভাস্কর্য।
বলা হয়, “এটাই সমস্যা।”
যেন হাসপাতালের অভাব নয়,
যেন কাজের অভাব নয়,
যেন ন্যায়ের অভাব নয়—
সমস্যা শুধু পাথরের মূর্তি।
এভাবে আসল সংকটগুলো আড়াল হয়,
আর মানুষের রাগ গিয়ে পড়ে শিল্পের ওপর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
মৌলবাদীদের ভয় ভাস্কর্যের রূপে না,
ভয় মানুষের স্বাধীন চিন্তায়।
ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে থাকে বলেই মানুষ জানে—
সে শুধু আজকের নয়, অতীতেরও অংশ।
সে একা নয়, তার আগেও লড়াই হয়েছে।
এই বোধটাই মৌলবাদীদের জন্য বিপজ্জনক।
ইতিহাসে দেখা যায়,
যেখানেই মৌলবাদ শক্ত হয়েছে,
সেখানে আগে বই পোড়ানো হয়েছে,
তারপর ছবি,
তারপর ভাস্কর্য।
কারণ শিল্প টিকে থাকলে
চিন্তা টিকে থাকে।
চিন্তা টিকে থাকলে
ভয় দিয়ে শাসন করা যায় না।
তাই ভাস্কর্য ভাঙার লড়াইটা আসলে
পাথরের সঙ্গে না,
মানুষের মাথার সঙ্গে।
প্রশ্নটা তাই হওয়া উচিত—
ভাস্কর্য থাকবে কি থাকবে না, সেটা নয়।
প্রশ্নটা হলো—
আমরা কি ভাবতে পারব, না শুধু মানতে শিখব?
ভাস্কর্য একদিন ভাঙা যায়।
কিন্তু যে সমাজ ভাবতে শেখে,
তাকে ভাঙা যায় না।
এই কারণেই মৌলবাদীরা
ভাস্কর্যের দিকে হাত বাড়ায়।
কারণ তারা জানে—
পাথরের চেয়ে চিন্তা বেশি শক্ত।