বাংলাদেশে সমকামীরা নিরাপদ—এই কথাটা কে বিশ্বাস করে?

Share

 

এই দেশে “নিরাপত্তা” শব্দটার মানে কী? পুলিশি পাহারা? নাকি চুপচাপ বেঁচে থাকার অনুমতি? যদি নিরাপত্তার মানে হয় নিজের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে থাকা, তাহলে বাংলাদেশে সমকামীরা নিরাপদ—এই কথা বলা সরাসরি মিথ্যা বলা।

এখানে সমকামী হওয়া মানে দ্বিগুণ অভিনয় করা। পরিবারে এক চরিত্র, সমাজে আরেক চরিত্র, নিজের ভেতরে তৃতীয় চরিত্র। নিজের মতো হওয়াটা এখানে বিলাসিতা। কারণ সত্যটা বললেই শুরু হয় শাস্তি—চাকরি যাবে, পরিবার মুখ ফিরিয়ে নেবে, আর যদি বেশি সাহস দেখাও, জীবনও যেতে পারে।

আমরা মুখে মানবতা বলি, কিন্তু বাস্তবে আমরা বাছাই করা মানবতা চর্চা করি। যারা আমাদের মতো, তারা মানুষ। আর যারা আলাদা, তারা “বিকৃতি”, “পাপ”, “রোগ”। এই শব্দগুলো ধর্মের নামে চালানো হয়, কিন্তু আসলে এগুলো সমাজের নিষ্ঠুরতার ভাষা।

আইন তো আরো স্পষ্ট। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বলে দেয়—তোমার ভালোবাসা অপরাধ। এই ধারা যতদিন থাকবে, ততদিন সমকামী মানুষ এই দেশে নাগরিক না, তারা সন্দেহভাজন। পুলিশ, সমাজ, পরিবার—সবাই তখন বিচারক হয়ে বসতে পারে।

২০১৬ সালে যাদের কুপিয়ে মারা হয়েছিল, তারা কোনো অস্ত্র ধরেনি। তারা শুধু বলেছিল—আমরাও আছি। তার ফল ছিল মৃত্যু। এরপর রাষ্ট্র বলেছে কী? সমাজ শিখেছে কী? একটাই শিক্ষা—চুপ থাকাই নিরাপদ।

আমরা বলি, বাংলাদেশ সহনশীল দেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিসের সহনশীলতা? শর্তসাপেক্ষে সহনশীলতা? যতক্ষণ তুমি নিজেকে লুকাবে, ততক্ষণ তুমি “ভালো মানুষ”? এই সহনশীলতা আসলে সহনশীলতা না, এটা নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থান।

সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো—নির্যাতনকে নৈতিকতার নাম দেওয়া। বলা হয়, “ওদের ঠিক করতে হবে”, “ওরা সমাজ ধ্বংস করছে”, “ওরা বিদেশি এজেন্ডা”। এই ভাষা সরাসরি সহিংসতার প্রস্তুতি। কারণ যখন কাউকে বিপদ বানানো হয়, তখন তাকে দমন করাটা কর্তব্যে পরিণত হয়।

নিরাপত্তা মানে শুধু মারধর না হওয়া নয়। নিরাপত্তা মানে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলতে পারা। বাংলাদেশে সমকামীরা সেটা পারে? পারে না। তারা নিরাপদ তখনই, যখন তারা অদৃশ্য। যখন তারা অন্যের মতো সেজে থাকে। যখন তারা নিজের জীবন নিজের বলে স্বীকার করে না।

এই সমাজে মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে ফতোয়া হয়, বই পোড়ানোর হুমকি আসে, আর সমকামিতা নিয়ে কথা উঠলেই বলা হয়—“এই আলোচনা ঠিক না”। কেন ঠিক না? কারণ আয়নায় তাকাতে ভয় লাগে। কারণ এই প্রশ্ন তুললে বোঝা যাবে, আমরা কতটা ভীত আর কতটা অমানবিক।

বাংলাদেশে সমকামীরা নিরাপদ কি না—এই প্রশ্নের উত্তর এক শব্দে দেওয়া যায়: না।

এবং এই “না”-এর দায় শুধু উগ্রবাদীদের নয়। এর দায় রাষ্ট্রের, সমাজের, আর আমাদের নীরবতারও।

যে সমাজ বলে, “তুমি যেমন, সেটা লুকাও”, সে সমাজ আসলে বলে, “তুমি গ্রহণযোগ্য না”। আর গ্রহণযোগ্য না মানেই একদিন তোমার ওপর হাত তোলা জায়েজ হয়ে যায়।

সমস্যা সমকামিতা না।
সমস্যা সহনশীলতার ভান।
সমস্যা সেই সমাজ, যে ভালোবাসাকেও অপরাধ বানায়।

যেদিন এই দেশে কেউ নিজের পরিচয় বলে ভয় পাবে না, সেদিন বলা যাবে—হ্যাঁ, বাংলাদেশ নিরাপদ।

আজ না।