এই প্রশ্নটা আজ অনেকের মাথায় ঘোরে। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র ভাষা, হুমকি, নারী শিক্ষা বিরোধী বক্তব্য, ভিন্নমত দমনের চেষ্টা—সব মিলিয়ে মনে হয়, উগ্রবাদ বুঝি সমাজের কেন্দ্রেই ঢুকে পড়ছে। তাহলে কি সত্যিই বাংলাদেশ উগ্রবাদীদের দখলে চলে যাবে?
সোজা উত্তর হলো: না, বিষয়টা এত সরল নয়। কিন্তু ঝুঁকিটা উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।
উগ্রবাদ শক্তিশালী হয় যখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়, আইন শিথিল হয়, আর রাজনীতি নৈতিক দিশা হারায়। তখন কিছু গোষ্ঠী ধর্ম বা আদর্শের নামে নিজেদের রক্ষাকর্তা হিসেবে হাজির হয়। তারা বলে, “আমরাই ঠিক, বাকিরা ভুল।” এই ভাষা প্রথমে মসজিদে, পরে রাস্তায়, শেষে রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে।
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে বহুত্ববাদী। এখানে গান আছে, নাটক আছে, বৈশাখ আছে, লালন আছে, রবীন্দ্রনাথ আছে। এই সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড এখনো ভাঙেনি। কিন্তু চাপ আছে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই চাপ বাড়াচ্ছে। মিথ্যা তথ্য, আবেগী ভিডিও, ধর্মীয় উস্কানি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তির জায়গায় আসে গালাগালি, আলোচনার জায়গায় আসে হুমকি।
উগ্রবাদীরা সাধারণত সংখ্যায় কম, কিন্তু শব্দে বড়। তারা ভয় তৈরি করে। এই ভয় থেকেই সাধারণ মানুষ নীরব হয়। নীরবতা যখন দীর্ঘ হয়, তখন মনে হয় উগ্রবাদই বুঝি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত। বাস্তবে তা নয়, কিন্তু দৃশ্যটা এমন লাগে।
আরেকটা বড় কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক হতাশা। কাজ নেই, মর্যাদা নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—এই পরিস্থিতিতে তরুণরা সহজ শত্রু খোঁজে। কেউ বলে, “নারী দায়ী”, কেউ বলে, “ভিন্ন ধর্ম দায়ী”, কেউ বলে, “সংস্কৃতি দায়ী”। এতে জটিল সমস্যার সহজ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। উগ্রবাদ এই সহজ ব্যাখ্যাই বিক্রি করে।
তবে এটাও সত্য, বাংলাদেশ এখনো উগ্রবাদীদের হাতে ধরা দেয়নি। কারণ এখানে এখনো প্রতিরোধ আছে। শিক্ষক আছেন, লেখক আছেন, সাংবাদিক আছেন, ছাত্র আছেন, যারা প্রশ্ন করেন। এই প্রশ্ন করাটাই উগ্রবাদীদের সবচেয়ে বড় ভয়। কারণ প্রশ্ন মানেই তাদের তৈরি করা সরল সত্যে ফাটল।
সমস্যা হবে যদি রাষ্ট্র দ্বিধায় পড়ে। যদি উগ্রবাদীদের খুশি রাখতে গিয়ে নীতি বদলায়। যদি পাঠ্যবই, আইন বা প্রশাসনে চাপের কাছে মাথা নোয়ানো শুরু হয়। তখন ধীরে ধীরে উগ্রবাদ সামাজিক রীতি হয়ে ওঠে। আর সামাজিক রীতি হয়ে গেলে তাকে আর “চরমপন্থা” বলে চেনা যায় না।
বাংলাদেশ উগ্রবাদীদের দখলে যাবে কি না, সেটা আসলে নির্ভর করছে দুই পক্ষের শক্তির ওপর—একদিকে যারা ভয় ছড়ায়, অন্যদিকে যারা যুক্তি ছড়ায়। একদিকে যারা নিষেধাজ্ঞা চায়, অন্যদিকে যারা স্বাধীনতা চায়। এই লড়াই নীরবে চলছে।
উগ্রবাদ কোনো ঝড়ের মতো হঠাৎ আসে না। এটা কুয়াশার মতো আসে। ধীরে ধীরে চারপাশ ঢেকে দেয়। মানুষ টের পায় দেরিতে। তাই এখনই প্রশ্ন তোলা জরুরি, এখনই অবস্থান নেওয়া জরুরি।
কারণ দেশ শুধু মানচিত্র নয়। দেশ হলো চিন্তার ধরন, কথাবার্তার ভাষা, মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার অধিকার, বই পড়ার স্বাধীনতা। এগুলো টিকে থাকলে বাংলাদেশ টিকবে। এগুলো হারালে মানচিত্র থাকলেও দেশ থাকবে না।
প্রশ্নটা তাই হওয়া উচিত—বাংলাদেশ কি উগ্রবাদীদের দখলে যাবে?
এর চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেটা হতে দেব?