মানুষত্ব মুছে ফেলার রাজনীতি

Share

 

মৌলবাদীরা সমকামীদের মানুষ মনে করে না।
এটাই মূল কথা।
তাদের চোখে সমকামী মানে মানুষ না—
সমকামী মানে সমস্যা,
সমকামী মানে পাপ,
সমকামী মানে শত্রু।

এই “মানুষ নয়” বানানোর কাজটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ মানুষ না হলে,
অধিকার লাগে না।
মায়া লাগে না।
মরলেও কিছু যায় আসে না।

এই রাজনীতি খুন দিয়ে শুরু হয় না।
এটা শুরু হয় ভাষা দিয়ে।

আগে বলা হয়—
“ওরা অস্বাভাবিক।”
তারপর বলা হয়—
“ওরা সমাজ নষ্ট করছে।”
তারপর বলা হয়—
“ওদের থামানো দরকার।”

এই তিন ধাপ পার হলে,
খুন আর খুন থাকে না।
খুন হয়ে যায় “শুদ্ধিকরণ”।

এটাই মৌলবাদের কৌশল।

কারণ সমকামী মানুষ তাদের বানানো ছাঁচে ঢোকে না।
তাদের দুনিয়ায়—
পুরুষ মানে একরকম,
নারী মানে একরকম,
ভালোবাসা মানে নির্দিষ্ট নিয়ম।

সমকামী মানুষ এই ছক ভেঙে দেয়।
আর ছক ভাঙা মানেই শত্রু।

তাই তারা বলে—
“এরা রোগ।”
“এরা পশ্চিমা ষড়যন্ত্র।”
“এরা সমাজ ধ্বংস করছে।”

এই কথাগুলো যুক্তি না।
এই কথাগুলো লাইসেন্স।
লাইসেন্স—ঘৃণার।
লাইসেন্স—হামলার।
লাইসেন্স—খুনের।

এখন আসি আসল প্রশ্নে—

তারা কি মানুষ নয়?

তারা কি রক্ত-মাংসে তৈরি না?
তারা কি ভয় পায় না?
তারা কি ভালোবাসে না?
তারা কি কাজ করে না?
তারা কি মায়ের গর্ভে জন্মায় না?

যদি এসবই করে,
তাহলে মানুষ হওয়ার শর্ত কী?
কার সঙ্গে শুয়েছে—এই হিসাব?

মানুষত্ব যদি বিছানার ওপর নির্ভর করে,
তাহলে সভ্যতা আসলে ভাঁওতা।

আর সবচেয়ে নোংরা প্রশ্ন—

তাদেরকে কেন হত্যা করতে হবে?

কোন ন্যায়ে?
কোন যুক্তিতে?
কোন মানবতায়?

খুন কোনো ধর্ম বাঁচায় না।
খুন কোনো সমাজ শুদ্ধ করে না।
খুন শুধু দেখায়—
কে দুর্বল,
কে শক্তিশালী।

যখন বলা হয়,
“ওদের মারলে পাপ নেই,”
তখন আসলে বলা হয়,
“ওরা আমাদের মতো না।”

এই ভাবনাই সমাজকে পশু বানায়।

আজ বলা হচ্ছে—
সমকামী মানুষ না।
কাল বলা হবে—
ভিন্ন ধর্মের মানুষ না।
পরশু বলা হবে—
ভিন্নমতের মানুষ না।

মানুষত্ব একবার শর্তসাপেক্ষ হলে,
কেউই নিরাপদ থাকে না।

সমকামী মানুষ আলাদা কোনো গ্রহ থেকে আসেনি।
তারা এই সমাজেই জন্মেছে।
এই ভাষায় কথা বলে।
এই বাতাসে শ্বাস নেয়।

তাদের অপরাধ একটাই—
তারা এমনভাবে ভালোবাসে,
যেটা মৌলবাদীদের নিয়ন্ত্রণে না।

কিন্তু নিয়ন্ত্রণ না মানা
আর খুনের যোগ্য হওয়া—
এই দুইয়ের মাঝে
সভ্যতার পুরো ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে।

মৌলবাদীরা যে কথা বলতে চায়,
তা আসলে খুব সোজা—
“আমাদের নিয়ম না মানলে
তুমি মানুষ না।”

এই কথাটাই আসল অপরাধ।

কারণ যে শক্তি ঠিক করে দেয়
কে মানুষ আর কে না,
সে শক্তি শেষ পর্যন্ত
কাউকেই মানুষ রাখে না।

এই প্রশ্ন তাই শুধু সমকামীদের না।
এই প্রশ্ন আমাদের সবার—

আমরা কি এমন সমাজ চাই
যেখানে ভালোবাসা অপরাধ
আর খুন যুক্তি?

নাকি এমন সমাজ চাই
যেখানে মানুষ হওয়াই
সবচেয়ে বড় পরিচয়?

এই দুইয়ের মধ্যে
কোনো মাঝামাঝি রাস্তা নেই।