মারধর, উচ্ছেদ, নিখোঁজ: আকাশ ও শিহাবের গল্প শুধু দু’জন মানুষের না

Share

কলেজ থেকে তাড়ানোর পাঁচ দিনের মাথায় মৌলবাদী গোষ্ঠী আকাশ ও শিহাবের বাড়িতে হামলা চালায়।
শুধু ছাত্র দু’জনকে নয়—তাদের মা-বাবাকেও মারাত্মকভাবে আহত করা হয়।
তাদের অপরাধ কী ছিল?
তারা চুরি করেনি।
তারা কাউকে আঘাত করেনি।
তারা কোনো সহিংসতায় জড়ায়নি।
তাদের অপরাধ ছিল—তারা মৌলবাদীদের পছন্দের মতো মানুষ না।
এই খবর শোনার পর আমি তাদের বাড়িতে যাই।
কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি—বাড়ি ফাঁকা।
তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
আকাশ, শিহাব, তাদের বাবা-মা—সবাই নিখোঁজ।
আমি খুঁজেছি।
অনেক চেষ্টা করেছি।
কিন্তু কাউকে পাইনি।
এই দৃশ্য আমাকে শুধু কাঁদায়নি,
আমাকে লজ্জিত করেছে এই সমাজের ওপর।
কারণ এখানে কোনো অপরাধ না করেও
মানুষকে পিটিয়ে আহত করা হলো,
তাদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হলো,
আর সমাজ নীরব থাকল।
এটাই কি ধর্ম?
এটাই কি নৈতিকতা?
এটাই কি ঈমানের শিক্ষা?
যারা ঘরে ঢুকে মানুষ মারে,
যারা পরিবারকে উচ্ছেদ করে,
যারা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে—
তারা ধর্মের সৈনিক না,
তারা সন্ত্রাসী।
এই হামলা কোনো হঠাৎ ঘটনা না।
এটা কলেজ থেকে বহিষ্কারের ধারাবাহিক ফল।
প্রথমে গুজব।
তারপর অপমান।
তারপর বহিষ্কার।
তারপর বাড়িতে হামলা।
এই পুরো প্রক্রিয়াটা পরিকল্পিত নিপীড়নের চেইন।
যারা কলেজে বসে আকাশ ও শিহাবকে “অনৈতিক” বলেছিল,
যারা প্রশাসনের ওপর চাপ দিয়েছিল,
যারা ফতোয়ার ভাষায় কথা বলেছিল—
তাদের হাতেই এই রক্ত।
কারণ ঘৃণা আগে বলা হয়,
তারপর মারা হয়।
এই ঘটনায় সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—
আইন কোথায় ছিল?
পুলিশ কোথায় ছিল?
প্রশাসন কোথায় ছিল?
একটা পরিবার মার খেয়ে এলাকা ছাড়ে,
আর রাষ্ট্র কিছুই দেখে না—
এটা রাষ্ট্র না, এটা ব্যর্থতা।
আজ আকাশ আর শিহাব নেই।
কাল কে থাকবে?
তোমার ছেলে?
আমার ভাই?
কোনো মেয়েটা, যে “অতিরিক্ত স্বাধীন”?
মৌলবাদ সব সময় একইভাবে শুরু হয়—
প্রথমে বলে, “ওরা খারাপ।”
তারপর বলে, “ওরা থাকতে পারবে না।”
তারপর বলে, “ওদের মারলেও দোষ নেই।”
এই পথের শেষ কোথায় আমরা জানি।
ইতিহাস জানে।
আফগানিস্তান জানে।
ইরান জানে।
এই সমাজ যদি আজও বলে—
“ওরা তো সমকামী, তাই হয়েছে”
তাহলে আগামীকাল কেউ বলবে—
“ও লেখে, তাই হয়েছে”
“ও ভিন্নমত, তাই হয়েছে”
আমি হতাশ।
কারণ আমি জানি—
ওরা কোনো অন্যায় করেনি।
তবু ওরা আহত হয়েছে।
তবু ওরা ঘরছাড়া হয়েছে।
তবু ওরা হারিয়ে গেছে।
এই সমাজ তাদের রক্ষা করতে পারেনি।
বরং মৌলবাদীদের হাতে তুলে দিয়েছে।
আমি এই ঘটনার নিন্দা করি।
আমি এই সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াই।
আমি এই ধর্মের নামে করা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াই।
কারণ ধর্ম যদি মানুষের ঘর ভাঙে,
তাহলে সে ধর্ম নয়,
সে দখলদারি।
কারণ নৈতিকতা যদি মারধর শেখায়,
তাহলে সে নৈতিকতা ভণ্ডামি।
আজ আকাশ আর শিহাব নেই।
কিন্তু তাদের রক্ত আমাদের প্রশ্ন রেখে গেছে—
এই দেশ কার?
নাগরিকদের, না মৌলবাদীদের?
যেদিন একজন মানুষ
নিজের পরিচয়ের কারণে
নিজের ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়,
সেদিন সেই দেশ স্বাধীন থাকে না।
শুধু মানচিত্রে থাকে।