খুন শব্দটা শুনলেই আমরা অপরাধ বুঝি। কিন্তু মৌলবাদী মানসিকতায় খুন সব সময় অপরাধ নয়—কখনো তা “শাস্তি”, কখনো “দায়িত্ব”, কখনো “ধর্মরক্ষা” হয়ে যায়। এখানেই ভয়ংকর প্রশ্নটা জন্ম নেয়—
একজন মানুষ কীভাবে আরেকজন মানুষকে মারাকে ন্যায্য মনে করতে পারে?
এর শুরু হয় ভাষা দিয়ে।
মৌলবাদী চিন্তায় মানুষ আর মানুষ থাকে না।
তাদের দুনিয়ায় সবাই দুই ভাগে বিভক্ত—
একদল “সঠিক পথে”,
আরেকদল “ভ্রষ্ট”।
এই “ভ্রষ্ট” শব্দটাই বিপজ্জনক।
কারণ ভ্রষ্ট মানে আর নাগরিক না,
ভ্রষ্ট মানে আর প্রতিবেশী না,
ভ্রষ্ট মানে শত্রু।
আর শত্রুকে মারলে অপরাধবোধ কাজ করে না।
এইভাবেই হত্যার পথ তৈরি হয়—
প্রথমে নাম বদলায়,
তারপর অধিকার বদলায়,
শেষে জীবন শেষ হয়।
আরেকটা জায়গায় মৌলবাদ ভয়ংকর—
তারা নিজেরাই বিচারক হয়ে বসে।
আইন, আদালত, সমাজ—সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে বলে,
“আমরাই ঠিক করব কে বাঁচবে, কে মরবে।”
এটা শুধু ধর্মের অপব্যাখ্যা না,
এটা ক্ষমতা দখলের মানসিকতা।
যে ক্ষমতা বলে—
আমার মত মানলে বাঁচবে,
না মানলে মরবে।
হত্যা তাদের কাছে কেবল একজন মানুষ সরানো নয়।
হত্যা মানে বাকিদের শিক্ষা দেওয়া।
একজন লেখক মরলে,
শতজন লেখক চুপ থাকে।
একজন শিক্ষক মারা গেলে,
হাজারজন শিক্ষক সাবধান হয়।
এটা আতঙ্কের রাজনীতি।
রক্ত দিয়ে নিয়ম বানানো।
আরেকটা দিক আছে—
মৌলবাদীরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে খুনকে কাজে লাগায়।
যখন চাকরি নেই,
ন্যায় নেই,
সম্মান নেই—
তখন মানুষ প্রশ্ন করতে পারে।
এই প্রশ্ন থামাতে
তারা বলে—
“শত্রু আছে।”
“ওরা ধর্ম নষ্ট করছে।”
এই শত্রুই পরে টার্গেট হয়।
এভাবে সমস্যার দায় যায়
একজন লেখক,
একজন শিল্পী,
একজন ভিন্নমতাবলম্বীর ঘাড়ে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো,
সহিংসতাকে তারা পবিত্র বানায়।
খুনকে বলা হয় “ইবাদত”,
“দায়িত্ব”,
“সওয়াবের কাজ”।
এই শব্দগুলো খুনের গন্ধ ঢেকে দেয়।
আর মানুষ ভাবতে শেখে—
হত্যা মানেই অপরাধ নয়।
কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়,
মৌলবাদীরা হত্যা করে
ধর্ম বাঁচাতে না,
ক্ষমতা বাঁচাতে।
যে মানুষ প্রশ্ন করে,
যে মানুষ গান গায়,
যে মানুষ লেখে,
যে মানুষ আলাদা ভাবে—
সে তাদের জন্য বিপদ।
আর বিপদ মানেই,
তাদের যুক্তিতে,
মুছে ফেলতে হবে।
ইতিহাসে বারবার এই ছবি দেখা গেছে—
কখনো বই পোড়ানো,
কখনো নারী বন্দি করা,
কখনো লেখক হত্যা।
রূপ বদলায়,
কিন্তু যুক্তি বদলায় না—
“আমরাই ঠিক, তাই তুমি বাঁচার যোগ্য নও।”
মৌলবাদীরা কেন হত্যা করতে চায়?
কারণ তারা জানে—
যুক্তি দিয়ে তারা কাউকে থামাতে পারবে না।
তাই তারা ছুরি দিয়ে থামাতে চায়।
এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটাই দায়িত্ব রাখে—
খুনকে ধর্মের ভাষায় ঢাকতে না দেওয়া,
ভয়কে স্বাভাবিক ভাবতে না শেখা।
কারণ যে চিন্তা মানুষ মারাকে ন্যায্য মনে করে,
সে চিন্তা শেষ পর্যন্ত
মানুষকেই মুছে ফেলে।