মৌলবাদীরা কেন হত্যা করতে চায়?

Share

মৌলবাদীদের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ভয়, হুমকি আর রক্তের ছবি। তারা শুধু ভিন্নমত দমন করে না, অনেক সময় সরাসরি হত্যাকাণ্ডেও জড়ায়। প্রশ্নটা তাই শুধু রাজনৈতিক না, গভীরভাবে মানবিক—
একজন মানুষ কীভাবে আরেকজন মানুষকে মারাকে ন্যায্য মনে করতে পারে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে মৌলবাদের মানসিক কাঠামোর ভেতরে।

প্রথমত, মৌলবাদ মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে।
তাদের কাছে মানুষ দুই ধরনের—“আমাদের লোক” আর “শত্রু”।
যারা তাদের মতো ভাবেন না, তারা আর ব্যক্তি থাকে না; হয়ে যায় “নাস্তিক”, “পাপী”, “বিকৃত”, “ধর্মদ্রোহী”। এই ভাষাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ যখন কাউকে মানুষ বলা বন্ধ করা হয়, তখন তাকে হত্যা করাও সহজ হয়ে যায়। মানবিকতা ধাপে ধাপে মুছে ফেলা হয়।

দ্বিতীয়ত, মৌলবাদীরা নিজেদের সত্যের একমাত্র মালিক মনে করে।
তারা ভাবে, ঈশ্বর বা আদর্শের পক্ষে কথা বলার অধিকার শুধু তাদেরই আছে। ফলে কে বাঁচবে, কে মরবে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তারা নিজেদের হাতে তুলে নেয়। এখানে আইন, নৈতিকতা বা সহানুভূতির জায়গা থাকে না। থাকে শুধু একরকম চিন্তার আধিপত্য।

তৃতীয়ত, হত্যা তাদের কাছে শুধু অপরাধ নয়, বার্তা।
একজন লেখক, শিক্ষক বা ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যা করার অর্থ হলো সমাজকে বলে দেওয়া—
“এই পথে গেলে পরিণতি হবে মৃত্যু।”
এইভাবে একজন মানুষকে মারলে হাজার জন ভয় পায়। মৌলবাদীদের কাছে এই ভয়ই শাসনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

চতুর্থত, তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে রক্ত ব্যবহার করে।
যখন সমাজে বেকারত্ব বাড়ে, বৈষম্য বাড়ে, রাজনীতি নষ্ট হয়—
তখন প্রশ্ন ওঠার কথা ছিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
কিন্তু মৌলবাদীরা সেই রাগ ঘুরিয়ে দেয় ভিন্নমতের মানুষের দিকে।
বলে, “ওরাই সমাজ নষ্ট করছে।”
এইভাবে আসল সমস্যার বদলে একজন লেখক, একজন শিল্পী, একজন শিক্ষক শত্রুতে পরিণত হয়।

পঞ্চমত, তারা সহিংসতাকে পবিত্র বানায়।
সাধারণ হত্যাকে তারা বলে “শাস্তি”, “জিহাদ”, “ধর্মরক্ষা”।
ভাষা বদলালে কাজ বদলায় না, কিন্তু বিবেক চুপ করে।
এই পবিত্রতার মোড়কেই সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
মৌলবাদীরা হত্যা করে আদর্শ বাঁচাতে না, হত্যা করে নিয়ন্ত্রণ বাঁচাতে।
যে মানুষ প্রশ্ন করে,
যে মানুষ গান গায়,
যে মানুষ লেখে,
যে মানুষ ভিন্নভাবে বাঁচে—
সে তাদের ক্ষমতার জন্য হুমকি।

আর হুমকি মানেই, তাদের যুক্তিতে, সরিয়ে দিতে হবে।

ইতিহাসে দেখা যায়, মৌলবাদ কখনো বই পুড়িয়েছে, কখনো নারীকে ঘরে আটকে রেখেছে, কখনো লেখককে কুপিয়ে মেরেছে। প্রতিবারই যুক্তি এক—“আমরাই ঠিক, তাই তোমার বাঁচার অধিকার নেই।”

কিন্তু কোনো সমাজ যদি এই যুক্তিকে মেনে নেয়, তাহলে সেখানে আর নাগরিক থাকে না, থাকে শুধু ভয় পাওয়া মানুষ।

মৌলবাদীরা কেন হত্যা করতে চায়?
কারণ তারা জানে—যুক্তি দিয়ে তারা টিকতে পারবে না।
তাই তারা রক্ত দিয়ে কর্তৃত্ব চায়।

এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটাই দায়িত্ব রেখে যায়—
ভয়ের কাছে মাথা না নোয়ানো,
হত্যাকে ধর্ম বা আদর্শের নামে বৈধ হতে না দেওয়া।

কারণ যে চিন্তা মানুষ মারাকে জায়েজ করে,
সে চিন্তা শেষ পর্যন্ত সমাজকেই হত্যা করে।