মৌলবাদীরা ভাস্কর্য ভাঙতে চায় কেন?

Share

ভাস্কর্য ভাঙার চেষ্টা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়েই দেখা গেছে—যেখানে মৌলবাদ শক্তিশালী হয়েছে, সেখানেই প্রথম আঘাত এসেছে শিল্পের ওপর। প্রশ্নটা তাই শুধু ভাস্কর্য নিয়ে নয়; প্রশ্নটা হলো—মৌলবাদীরা শিল্পকে এত ভয় পায় কেন?

প্রথম কারণ, ভাস্কর্য মানে স্মৃতি।
একটি ভাস্কর্য কেবল পাথর বা ধাতু নয়, এটি ইতিহাসের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, বা কোনো চিন্তার মানুষ—সবই ভাস্কর্যের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। মৌলবাদীরা চায় না মানুষ অতীতকে মনে রাখুক নিজের মতো করে। তারা চায় একটাই ব্যাখ্যা, একটাই ইতিহাস। তাই ভাস্কর্য ভাঙা মানে স্মৃতি ভাঙা, বিকল্প ইতিহাস মুছে ফেলা।

দ্বিতীয় কারণ, ভাস্কর্য মানে প্রশ্ন।
একটি ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে থাকলেই মানুষ জিজ্ঞেস করে—এটা কার? কেন বানানো হলো? কী বোঝাতে চায়? এই প্রশ্ন করার অভ্যাসটাই মৌলবাদীদের সমস্যা। কারণ মৌলবাদ টিকে থাকে প্রশ্নহীন আনুগত্যের ওপর। যেখানে মানুষ ভাবতে শেখে, সেখানে আদেশ টেকে না।

তৃতীয় কারণ, ভাস্কর্য মানে ধর্মের বাইরে নৈতিকতা।
মৌলবাদীরা চায়—নৈতিকতা মানে শুধু তাদের ব্যাখ্যা করা ধর্মীয় নিয়ম। কিন্তু ভাস্কর্য দেখায়, মানুষ ধর্ম ছাড়াও মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে—স্বাধীনতা, প্রতিবাদ, মানবতা। এই ধারণাই তাদের জন্য হুমকি। তাই তারা বলে, “এটা মূর্তি”, “এটা হারাম”, অথচ আসল সমস্যা ধর্ম না, সমস্যা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়।

চতুর্থ কারণ, ভাস্কর্য ভাঙা একটা রাজনৈতিক বার্তা।
ভাস্কর্য ভাঙা মানে বলা—“আমাদের অনুমতি ছাড়া কিছু থাকবে না।” এটা শক্তি প্রদর্শন। রাষ্ট্র যদি নরম হয়, সমাজ যদি চুপ থাকে, তাহলে তারা বুঝে যায়—এই ভাষায় কথা বলা যাবে। তাই ভাস্কর্য শুধু শিল্প নয়, হয়ে ওঠে ক্ষমতার মঞ্চ।

পঞ্চম কারণ, সহজ শত্রু দরকার।
যখন বেকারত্ব বাড়ে, দুর্নীতি বাড়ে, শিক্ষা ভেঙে পড়ে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে না পেরে মৌলবাদীরা বলে, “ভাস্কর্যই সমস্যা।” যেন দেশের সব সংকটের দায় পাথরের মূর্তির ঘাড়ে। এটা দায় ঘোরানোর রাজনীতি।

সবচেয়ে বড় কথা, মৌলবাদীদের সমস্যা ভাস্কর্যের আকারে না, মানুষের স্বাধীনতায়।
ভাস্কর্য বলে—তুমি দেখতে পারো, ভাবতে পারো, ব্যাখ্যা করতে পারো।
মৌলবাদ বলে—তুমি মানবে, প্রশ্ন করবে না।

এই দুই ধারণা একসাথে থাকতে পারে না।

ইতিহাসে দেখা যায়, যেখানে মৌলবাদ জিতেছে, সেখানে আগে বই পোড়ানো হয়েছে, তারপর ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে, তারপর মানুষকে চুপ করানো হয়েছে। শিল্প ধ্বংস মানে সমাজের কণ্ঠ ধ্বংস।

তাই ভাস্কর্য ভাঙার প্রশ্নটা আসলে ধর্মীয় না, সাংস্কৃতিকও না—এটা রাজনৈতিক।
এটা ক্ষমতার প্রশ্ন।

মৌলবাদীরা ভাস্কর্য ভাঙতে চায় কারণ তারা জানে—
যতক্ষণ মানুষ গান গায়, ছবি আঁকে, ভাস্কর্য বানায়,
ততক্ষণ মানুষ পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে যাবে না।

ভাস্কর্য ভাঙা মানে শুধু পাথর ভাঙা না।
ভাস্কর্য ভাঙা মানে চিন্তার ওপর আঘাত।
আর চিন্তার ওপর আঘাত মানেই সমাজকে অন্ধ করার চেষ্টা।

প্রশ্নটা তাই হওয়া উচিত—
ভাস্কর্য থাকবে কি না নয়,
প্রশ্নটা হলো—
আমরা কি ভাবার অধিকার রাখব, না শুধু মানার অধিকার?

এই লড়াইয়ে ভাস্কর্য শুধু একটি প্রতীক।
আসল লড়াইটা মানুষের স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে।

আর যেখানেই স্বাধীন চিন্তা থাকে,
সেখানেই মৌলবাদ অস্বস্তিতে পড়ে।

এটাই তাদের মাথাব্যথার মূল কারণ।