মৌলবাদীরা সমকামীদের মানুষই মনে করে না—কেন?

Share

মৌলবাদী চিন্তার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, তারা আগে কাউকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করা বন্ধ করে, তারপর তার ওপর নির্যাতনকে জায়েজ করে। সমকামীদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়। তাদের চোখে সমকামী মানে আর মানুষ না—সে হয়ে যায় “পাপ”, “ব্যাধি”, “ষড়যন্ত্র”, “পশ্চিমা এজেন্ট”। প্রশ্ন হলো, কেন এই মানুষত্ব কেড়ে নেওয়া?

প্রথম কারণ হলো নৈতিকতার একচেটিয়া মালিকানা
মৌলবাদীরা ভাবে, নৈতিকতা কেবল তাদের ব্যাখ্যাতেই আছে। তাদের মতো না হলেই তুমি “ভুল মানুষ”। আর যখন কাউকে ভুল মানুষ বানানো হয়, তখন ধীরে ধীরে তাকে মানুষ হিসেবেই আর দেখা হয় না। সে হয়ে ওঠে “সমস্যা”। আর সমস্যা হলে তাকে “সরানো” যায়—এই ভাবনাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

দ্বিতীয় কারণ হলো ভয়ের রাজনীতি
সমকামী মানুষ দেখিয়ে দেয়—ভালোবাসার ধরন একরকম না। পরিচয় একরেখা না। এই ভিন্নতা মৌলবাদী কাঠামোকে অস্থির করে। কারণ মৌলবাদ চায় সরল, শক্ত, নিয়ন্ত্রিত সমাজ—পুরুষ মানে একরকম, নারী মানে একরকম, পরিবার মানে একরকম। সমকামী মানুষ এই ছক ভাঙে। ছক ভাঙলেই তাকে “অস্বাভাবিক” বানাতে হয়।

তৃতীয় কারণ হলো দেহ আর আকাঙ্ক্ষার ওপর নিয়ন্ত্রণের বাসনা
মৌলবাদী চিন্তা চায় মানুষের শরীর, সম্পর্ক আর ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করতে। কে কাকে ভালোবাসবে, কীভাবে ভালোবাসবে—এই সিদ্ধান্ত যদি মানুষ নিজে নেয়, তাহলে তাদের কর্তৃত্ব ভাঙে। তাই সমকামী সম্পর্ক তাদের কাছে শুধু আলাদা না, “বিপজ্জনক”। কারণ এতে প্রমাণ হয়—মানুষ নিজের জীবন নিজে বেছে নিতে পারে।

চতুর্থ কারণ হলো আমরা” আর “ওরা” বানানোর রাজনীতি
মৌলবাদ টিকে থাকে বিভাজনের ওপর।
আমরা পবিত্র,
ওরা অপবিত্র।
আমরা ঠিক,
ওরা ভুল।

সমকামী মানুষ এই বিভাজনের জন্য আদর্শ টার্গেট। তারা সংখ্যায় কম, সামাজিকভাবে দুর্বল, সহজে কলঙ্কিত করা যায়। তাই তাদের “মানুষ” না বানিয়ে “চিহ্ন” বানানো হয়—যেন তাদের সঙ্গে যা-ই করা হোক, সেটা নৈতিক বলে মনে হয়।

এখন প্রশ্নটা আসে—
তারা কি মানুষ নয়?

তারা কি হাঁটে না?
হাসে না?
ভয় পায় না?
ভালোবাসে না?
কাজ করে না?
ট্যাক্স দেয় না?
পরিবারে জন্মায় না?

তারা মানুষ ছাড়া আর কী?

শুধু ভালোবাসার ধরন আলাদা হলেই যদি মানুষত্ব চলে যায়, তাহলে মানুষ হওয়ার শর্ত কী? কার ভালোবাসা বৈধ, কারটা অবৈধ—এই সার্টিফিকেট কে দেয়?

আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন—
তাদেরকে কেন হত্যা করতে হবে?

কোন যুক্তিতে?
কোন আইনে?
কোন মানবতায়?

খুন কখনো নৈতিকতা রক্ষা করে না।
খুন কখনো সমাজ শুদ্ধ করে না।
খুন শুধু একটাই জিনিস করে—মানুষকে মানুষ মেরে ফেলার অভ্যাস শেখায়।

যখন বলা হয়, “ওরা মানুষ না”, তখন খুন সহজ হয়।
যখন বলা হয়, “ওরা রোগ”, তখন খুন চিকিৎসা মনে হয়।
যখন বলা হয়, “ওরা শত্রু”, তখন খুন দেশপ্রেম মনে হয়।

এই ভাষাই খুনের রাস্তা বানায়।

সমস্যা সমকামিতা না।
সমস্যা হলো—কে ঠিক করবে, কে মানুষ আর কে না।

আজ যদি বলা হয়, “সমকামী মানুষ না”,
কাল বলা হবে, “ভিন্ন ধর্মের মানুষ না”,
পরশু বলা হবে, “ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ না”।

একবার মানুষত্ব কেড়ে নেওয়ার রাজনীতি শুরু হলে, তার শেষ থাকে না।

এই দেশে সমকামী মানুষ আলাদা কোনো গ্রহ থেকে আসেনি।
তারা এই সমাজেই জন্মেছে।
এই ভাষায় কথা বলে।
এই রাস্তায় হাঁটে।
এই রাষ্ট্রের নাগরিক।

তাদের একমাত্র “অপরাধ”—তারা কার সঙ্গে ভালোবাসে, সেটা মৌলবাদীদের পছন্দ না।

কিন্তু পছন্দ না হওয়া আর হত্যা—এই দুইয়ের মাঝে আকাশ–পাতাল তফাৎ আছে।

যে সমাজ বলে, “তুমি মানুষ না”,
সে সমাজ একদিন কাউকেই মানুষ বলে মানবে না।

আর যে রাষ্ট্র বলে, “এই খুনগুলো নিয়ে আমরা চুপ থাকব”,
সে রাষ্ট্র একদিন সব নাগরিককেই অনিরাপদ করে তুলবে।

তাই প্রশ্নটা আসলে সমকামীদের নিয়ে না।
প্রশ্নটা আমাদের নিয়ে—
আমরা কি এমন সমাজ চাই,
যেখানে ভালোবাসার জন্য মানুষ মরবে?

না কি এমন সমাজ চাই,
যেখানে মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়?

এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে,
আমরা সভ্য হচ্ছি—নাকি শুধু শক্ত হচ্ছি।