রাষ্ট্র সমকামীদের অধিকার নিয়ে চুপ কেন?

Share

 

বাংলাদেশের সংবিধান বলে, রাষ্ট্র নাগরিকের সমতা নিশ্চিত করবে। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ—কোনো কিছুর ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না। কাগজে-কলমে আমরা সবাই সমান। কিন্তু বাস্তবে সমকামী মানুষদের ক্ষেত্রে এই সমতা কোথায়?

আইনের চোখে তারা আজও “অপরাধী”। ব্রিটিশ আমলের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা এখনো বহাল। ভালোবাসাকে অপরাধ বানানো এই ধারাটা শুধু যে সেকেলে, তা নয়—এটা সরাসরি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ রাষ্ট্র জানে, সমকামিতা কোনো অপরাধ নয়, কোনো রোগও নয়। তবুও রাষ্ট্র চুপ।

এই চুপ করে থাকাটাই সবচেয়ে রাজনৈতিক।

কারণ রাষ্ট্র যদি সত্যিই না-জানত, তবে বিষয়টা অজ্ঞতা বলা যেত। কিন্তু রাষ্ট্র জানে। জানে যে সমকামী মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়। জানে যে পুলিশি হয়রানি হয়। জানে যে পরিবার থেকে বের করে দেওয়া হয়। জানে যে চাকরি, বাসা, চিকিৎসা—সব জায়গায় বৈষম্য চলে। তবুও রাষ্ট্র বলে না, “এরা নাগরিক, এদের অধিকার আছে।”

প্রশ্ন হলো, কেন?

একটা বড় কারণ হলো ভয়ের রাজনীতি। সমকামীদের অধিকার মানেই অনেকে ভাবেন, ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়া। রাষ্ট্র জানে, এই দেশে ধর্মীয় অনুভূতি রাজনৈতিক শক্তি। সেই শক্তিকে বিরক্ত করা মানে ভোট হারানোর ঝুঁকি। তাই রাষ্ট্র নিরাপদ জায়গায় থাকে। নীরবতা। দায় এড়িয়ে যাওয়া।

আরেকটা কারণ সামাজিক ভণ্ডামি। আমরা মুখে বলি, “মানবাধিকার।” আন্তর্জাতিক দিবস পালন করি, সেমিনার করি, পোস্টার লাগাই। কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে, এই মানুষগুলোও কি মানুষ—তখন আমরা চুপ করে যাই। কারণ তারা সংখ্যায় কম, দুর্বল, এবং সহজ টার্গেট।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত সবচেয়ে দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো। বাস্তবে রাষ্ট্র দাঁড়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভয়, অস্বস্তি আর কুসংস্কারকে রাষ্ট্র “জনমত” বলে বৈধতা দেয়।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই নীরবতা সহিংসতাকে বৈধ করে তোলে। যখন রাষ্ট্র বলে না, “তাদের ওপর হামলা অপরাধ,” তখন সমাজ বুঝে নেয়—এই হামলা সহনীয়। কারও চাকরি গেলে খবর হয় না। কারও বাসা ভাড়া না দিলে প্রশ্ন ওঠে না। কারও জীবন ঝুঁকিতে পড়লে রাষ্ট্র দায় নেয় না।

আমরা ভুলে যাই, সমকামী মানুষ আলাদা কোনো প্রজাতি না। তারা আমাদের ভাই, বোন, সহকর্মী, বন্ধু। তারা ট্যাক্স দেয়, ভোট দেয়, আইন মানে। শুধু ভালোবাসার ধরনটা আলাদা।

রাষ্ট্রের কাজ ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করা নয়। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া।

আজ রাষ্ট্র যদি বলে, “আমরা এই মানুষদের নাগরিক হিসেবেই দেখি,” তাহলে সমাজ একদিন না একদিন বদলাবে। যেমন বদলেছে বাল্যবিবাহ, নারীশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনার প্রশ্নে। একসময় এসবও ছিল “অগ্রহণযোগ্য”।

রাষ্ট্র চুপ থাকলে পরিবর্তন হয় না। চুপ থাকলে বৈষম্য টিকে থাকে।

এই নীরবতা আসলে নিরপেক্ষতা নয়। এটা পক্ষ নেওয়া—বৈষম্যের পক্ষে।

প্রশ্নটা তাই শুধু সমকামীদের অধিকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো, রাষ্ট্র কাকে মানুষ বলে মানে? আর কাকে নীরবে বাদ দেয়?

যে রাষ্ট্র কিছু নাগরিককে “দেখেই না”, সে রাষ্ট্র একদিন অন্যদেরও না-দেখা শুরু করে। আজ সমকামী, কাল সংখ্যালঘু, পরশু ভিন্নমতাবলম্বী।

নাগরিকত্ব কোনো পুরস্কার না। এটা জন্মগত অধিকার।

রাষ্ট্র যদি এই অধিকার সবার জন্য সমানভাবে না মানে, তাহলে সমস্যাটা শুধু সমকামিতা নিয়ে নয়। সমস্যাটা রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান নিয়ে।

আর সেই প্রশ্নটা আমাদেরই তুলতে হবে। কারণ চুপ করে থাকাই সবচেয়ে সহজ কাজ। কিন্তু ইতিহাস বলে, চুপ থাকাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।