লেখার অপরাধে মৃত্যুপরোয়ানা: আমার বিরুদ্ধে মৌলবাদী যুদ্ধের পূর্ণ কাহিনি

Share

আমি সমকামীদের পক্ষে লিখেছিলাম।
আমি কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলিনি,
আমি কাউকে মারিনি,
আমি কাউকে তাড়াইনি।
আমি শুধু বলেছিলাম—
আকাশ, শিহাব আর তাদের মতো মানুষরা অপরাধী না।
তারা মানুষ।
এই কথাটাই হেফাজতে ইসলামের কাছে অপরাধ হয়ে গেল।
২ মে ২০২৩।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আমার স্কুলের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়—
আমার লেখার কারণে এলাকায় “ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা” সৃষ্টি হচ্ছে।
সুতরাং আমাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করতে হবে।
অর্থাৎ,
ধর্মীয় উগ্রবাদীদের চোখে
মানুষের পক্ষে কথা বলা মানেই বিশৃঙ্খলা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখা মানেই অপরাধ।
৩ মে ২০২৩।
স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে ডেকে পাঠায়।
অধ্যক্ষ স্পষ্ট করে বলেন—
আমি যেন আর ব্লগে না লিখি।
কারণ ধর্মীয় নেতাদের চাপ আসছে।
তিনি বলেন,
আমি যদি সমকামীদের পক্ষে লেখা বন্ধ না করি,
তাহলে আমাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
আমি প্রশ্ন করি—
“ওরা তো কোনো অপরাধ করেনি।
তাহলে কেন তাদের বহিষ্কার করা হলো?”
“আমি তো কাউকে আঘাত করিনি।
তাহলে কেন আমাকে চাকরি হারাতে হবে?”
অধ্যক্ষ কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
শুধু একটাই কথা বলেছেন—
“চাকরি করতে চাইলে লেখা বন্ধ করো।”
এটাই আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিকতা—
ন্যায় না, সত্য না,
বরং ভয় মেনে চলো।
৮ মে ২০২৩।
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে
কয়েকজন উগ্র মৌলবাদী
ধারালো অস্ত্র নিয়ে
আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়।
এটা হুমকি ছিল না।
এটা সতর্কতা ছিল না।
এটা সরাসরি হত্যাচেষ্টা।
স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আমি বেঁচে যাই।
কিন্তু গুরুতর আহত হই।
১৭ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়।
আমার শরীর সেলাই করা হলো,
কিন্তু প্রশ্নগুলো সেলাই হলো না—
আমি কী অপরাধ করেছি?
মানুষের পক্ষে কথা বলা কি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ?
সমকামী শিক্ষার্থীদের পক্ষে দাঁড়ানো কি কুফরি?
এই পুরো ঘটনাটা কোনো বিচ্ছিন্ন হামলা না।
এটা একটানা শিকার বানানোর প্রক্রিয়া।
প্রথমে তারা ছাত্রদের তাড়ায়।
তারপর তাদের বাড়িতে হামলা করে।
তারপর যারা প্রতিবাদ করে,
তাদের টার্গেট করে।
এটাই মৌলবাদের নিয়ম।
এই ধর্মীয় নেতারা বলে—
“আমরা সমাজ রক্ষা করছি।”
কিন্তু তারা আসলে যা করছে তা হলো—
ভয় তৈরি করছে,
মতপ্রকাশ বন্ধ করছে,
আর রক্ত দিয়ে নীরবতা কিনছে।
যে দেশে লেখার কারণে
একজন শিক্ষককে মারতে আসে,
সে দেশে শিক্ষা থাকে না—
শুধু আতঙ্ক থাকে।
যে দেশে সমকামী শিক্ষার্থীকে
কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়,
তারপর তার বাড়িতে হামলা হয়,
তারপর যারা প্রতিবাদ করে
তাদের হত্যা করতে যায়—
সে দেশ আর রাষ্ট্র থাকে না,
সে দেশ বন্দিশালা হয়।
আমার ওপর হামলা মানে
শুধু আমার ওপর হামলা না।
এটা মতপ্রকাশের ওপর হামলা।
এটা মানবতার ওপর হামলা।
এটা সংবিধানের ওপর হামলা।
আমি বেঁচে গেছি।
কিন্তু সবাই তো বাঁচে না।
আজ আমি লিখছি,
কারণ আমি জানি—
চুপ থাকলে পরের আঘাত আরও শক্ত হবে।
আমি এই ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াই।
আমি এই নৈতিকতার মুখোশ পরা বর্বরতার বিরুদ্ধে দাঁড়াই।
আমি বলি—
মানুষ হওয়া কোনো অপরাধ না।
ভিন্ন হওয়া কোনো অপরাধ না।
আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখা
মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হতে পারে না।
যে ধর্ম মানুষকে পেটাতে শেখায়,
সে ধর্ম বিশ্বাস না—
সে অস্ত্র।
যে সমাজ অন্যায়ের পাশে দাঁড়ায়,
সে সমাজ অসুস্থ।
আমি লিখি,
কারণ ভয় পেলে
এই দেশটা ওদের হয়ে যাবে।