শিক্ষার নামে বর্বরতা: আকাশ আর শিহাবকে বহিষ্কার করার লজ্জাজনক ইতিহাস

Share

১৮ এপ্রিল ২০২৩।
এই দিনটিতে কিছু মৌলবাদী জানতে পারে—আমার কলেজে আকাশ ও শিহাব নামে দু’জন শিক্ষার্থী সমকামী।
এই তথ্য জানার সঙ্গে সঙ্গেই হেফাজতে ইসলাম ও জামাতে ইসলামীর নেতা আকরাম হোসেন কলেজ কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন—তাদের যেন বহিষ্কার করা হয়।
এটা কোনো “নৈতিক উদ্বেগ” ছিল না।
এটা ছিল পরিকল্পিত নিপীড়ন।
দুঃখজনকভাবে, এই নিপীড়নের সবচেয়ে সক্রিয় সহযোগী হয়ে ওঠেন আমাদের কলেজেরই কয়েকজন শিক্ষক—যাদের কাজ ছিল শিক্ষার্থীকে রক্ষা করা, মানুষ বানানো, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
তারাই শিহাব ও আকাশের সম্পর্ককে “অনৈতিক” ও “ধর্মবিরোধী” বলে ঘোষণা দেন।
তারাই ক্লাসরুমের ভেতর গুজব ছড়ান।
তারাই ধীরে ধীরে কলেজ প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ান।
শিক্ষক যখন নৈতিক পুলিশে পরিণত হয়, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কসাইখানায় রূপ নেয়।
২১ এপ্রিল ২০২৩।
কলেজ কর্তৃপক্ষ আকাশ ও শিহাবকে ডেকে পাঠায়।
কোনো লিখিত অভিযোগ নেই।
কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ নেই।
তবু তাদের সামনে বসিয়ে করা হয় অপমানজনক প্রশ্ন—
তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে,
তাদের সম্পর্ক নিয়ে,
তাদের “স্বাভাবিকতা” নিয়ে।
তাদের কথা শোনার কোনো আন্তরিক চেষ্টা করা হয়নি।
তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
রায় আগেই লেখা ছিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই তথাকথিত “শাস্তিমূলক ব্যবস্থা” নেওয়া হয়,
এবং কার্যত তাদের কলেজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
এটা বহিষ্কার না।
এটা জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া।
এটা সামাজিক হত্যার একটি সংস্করণ।
তাদের অপরাধ কী ছিল?
চুরি?
নকল?
হিংসা?
না।
তাদের অপরাধ ছিল—তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো না।
তারা ভিন্ন।
এই ঘটনায় সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এটা ধর্মের নামে করা হয়েছে, কিন্তু ধর্ম এখানে মুখোশ মাত্র।
আসল চরিত্র হলো ক্ষমতা, ভয় আর নিয়ন্ত্রণ।
হেফাজত ও জামাত চায় সমাজে ঘোষণা দিতে—
“আমরা ঠিক করে দেব, কে থাকবে, কে থাকবে না।”
আর কিছু শিক্ষক সেই ঘোষণার দালাল হয়েছে।
আজ তারা সমকামী ছাত্রকে তাড়িয়েছে।
আগামীকাল তাড়াবে নাস্তিককে।
তারপর লেখককে।
তারপর মেয়েটাকে, যে বোরখা পরেনি।
এই পথের শেষ কোথায়?
তালেবান, ইরান, সৌদি মডেলের দিকে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো মসজিদের মিম্বর না।
এখানে ফতোয়া চলবে না।
এখানে চলবে আইন, যুক্তি আর মানবিকতা।
কোন আইনে আকাশ আর শিহাবকে বের করে দেওয়া হলো?
কোন নিয়মে ব্যক্তিগত সম্পর্ক শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো?
কোন অধ্যাদেশে লেখা আছে—“তুমি সমকামী, তাই তুমি শিক্ষার অধিকার পাবে না”?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই।
আছে শুধু ভয়।
আর ভয় দেখানো রাজনীতি।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের কলেজ প্রমাণ করেছে—
তারা শিক্ষার্থীকে নয়, মৌলবাদী চাপকে গুরুত্ব দেয়।
তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নয়, ধর্মীয় গুন্ডাদের খুশি করতে চায়।
আমি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করি।
আমি এই শিক্ষকসুলভ নিষ্ঠুরতার বিরোধিতা করি।
আমি এই ধর্মের নামে চালানো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই।
কারণ শিক্ষা মানে শুধু বই না।
শিক্ষা মানে মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করা।
যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নেই,
সেই প্রতিষ্ঠান নামের যোগ্য না।
যেখানে ভিন্ন হওয়া অপরাধ,
সেখানে জ্ঞান জন্মায় না,
সেখানে কেবল ভয়ের চাষ হয়।
আকাশ ও শিহাবের সঙ্গে যা করা হয়েছে,
তা শুধু দু’জন ছাত্রের সঙ্গে অন্যায় না।
তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মুখে থুতু মারা।
আজ তারা বেরিয়ে গেছে।
কিন্তু ইতিহাস থেকে এই লজ্জা বের হবে না।
আর আমরা যদি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে না বলি,
তাহলে পরের আকাশ, পরের শিহাব—
আর কেউ নিরাপদ থাকবে না।