সমকামীদের হত্যা কি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে?

Share

 

বাংলাদেশে সমকামী বা এলজিবিটিকিউ মানুষের ওপর হামলা নতুন কিছু নয়। ভয় দেখানো, মারধর, ব্ল্যাকমেইল, চাকরি হারানো—এসব বহুদিনের গল্প। কিন্তু হত্যাকাণ্ড যখন ঘটে, তখন প্রশ্নটা আর ব্যক্তিগত থাকে না। তখন সেটা রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

২০১৬ সালে রূপবান পত্রিকার সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু তনয়কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এটা ছিল প্রকাশ্যভাবে সমকামী অধিকারের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ওপর সরাসরি হামলা। রাষ্ট্র তখন বলেছিল, “তদন্ত হবে।” হয়েছে কি? বিচার হয়েছে কি? সমাজ আজও জানে না।

এখানেই প্রশ্নটা জন্ম নেয়—এই হত্যাকাণ্ডগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি রাষ্ট্রের নীরব সম্মতি এতে কাজ করছে?

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা মানেই যে সরকার আদেশ দিয়ে হত্যা করায়, বিষয়টা এমন না। পৃষ্ঠপোষকতা অনেক সময় আসে নীরবতার মাধ্যমে
যখন হত্যার পর শক্ত বার্তা আসে না,
যখন দোষীরা ধরা পড়ে না,
যখন আক্রান্তদের “ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন” বলে দায় চাপানো হয়,
তখন রাষ্ট্র আসলে কী করছে?

তখন রাষ্ট্র বলছে না, “এটা অপরাধ।”
বরং বলছে, “এটা অস্বস্তিকর, এড়িয়ে যাই।”

আইন এখনো সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখে। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বহাল থাকায় সমাজ বুঝে নেয়—এই মানুষগুলো পুরোপুরি বৈধ নাগরিক না। ফলে তাদের ওপর হামলা করলে নৈতিক অপরাধবোধ কম থাকে। এই আইন শুধু বৈষম্য করে না, সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে।

আর সেই পরিবেশের দায় রাষ্ট্রের।

যদি রাষ্ট্র সত্যিই মনে করত, সমকামী মানুষের জীবন সমান মূল্যবান, তাহলে কী করত?

– হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার করত
– প্রকাশ্যে বলত, “যৌন পরিচয়ের কারণে কাউকে হত্যা অপরাধ”
– পুলিশকে নির্দেশ দিত, ভিকটিমকে হয়রানি না করতে
– অন্তত আইন থেকে অপরাধের তকমাটা সরাত

কিন্তু এগুলোর কোনোটাই জোরালোভাবে হয়নি।

এর মানে কি রাষ্ট্র চায়, তারা মরুক?
হয়তো না।
কিন্তু এর মানে রাষ্ট্র মরলেও খুব অস্বস্তি বোধ করে না

এই জায়গাটাই ভয়ংকর।

কারণ রাষ্ট্র যখন কিছু মানুষের মৃত্যুতে নীরব থাকে, তখন সমাজ বুঝে নেয়—এই মৃত্যু সহনীয়। তখন উগ্র গোষ্ঠী সাহস পায়। তারা জানে, প্রতিক্রিয়া দুর্বল হবে। বিচার অনিশ্চিত থাকবে।

এটা সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা না হলেও, এটা পরোক্ষ অনুমোদন

আমরা প্রায়ই বলি, “এগুলো বিদেশি সংস্কৃতি।”
কিন্তু খুন কি বিদেশি সংস্কৃতি?
মানুষের জীবন কি আমদানিকৃত?

সমকামী মানুষ এই দেশের নাগরিক। তারা ট্যাক্স দেয়, ভোট দেয়, আইন মানে। তাদের রক্তও এই মাটিতে পড়ে। রাষ্ট্র যদি বলে, “তোমার ভালোবাসা অপরাধ,” আর সমাজ যদি বলে, “তোমার জীবন মূল্যহীন,” তাহলে মাঝখানে রাষ্ট্র দাঁড়াচ্ছে কোথায়?

নীরবতায়।

এই নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা না।
এটা অবস্থান।
এটা বলছে—কিছু মানুষের জীবন কম গুরুত্বপূর্ণ।

আজ যদি সমকামীদের হত্যা হয় আর রাষ্ট্র শক্তভাবে না দাঁড়ায়,
আগামীকাল সংখ্যালঘু,
তারপর ভিন্নমতাবলম্বী,
তারপর যে কেউ।

রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা যুদ্ধ বা নির্বাচন নয়।
রাষ্ট্রের পরীক্ষা হলো—সবচেয়ে অপ্রিয় নাগরিককে সে রক্ষা করে কি না।

এই প্রশ্ন তাই শুধু সমকামীদের নিয়ে না।
এই প্রশ্ন রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে।

আর চরিত্র যদি নীরবতায় গড়া হয়,
তাহলে সেই রাষ্ট্র একদিন সবার জন্যই অনিরাপদ হয়ে ওঠে।