শিক্ষক হিসেবে কি সমকামী ছাত্রের পাশে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ?
এই প্রশ্নটা আজকাল ফিসফিস করে নয়, জোরে জোরে করা হচ্ছে—
একজন শিক্ষক কি সমকামী ছাত্রের পাশে দাঁড়াতে পারবে?
তার কথা শুনবে?
তার নিরাপত্তা চাইবে?
তার সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করবে?
অনেকে ভাবছে, এটা নাকি “নৈতিক সমস্যা”, “ধর্মীয় সমস্যা”, “শিক্ষকের সীমা ছাড়ানো”।
কিন্তু আসলে এটা একটাই প্রশ্ন—
শিক্ষক কি মানুষ হওয়ার অধিকার রাখে, না শুধু সিলেবাসের দারোয়ান হবে?
একজন শিক্ষক মানে শুধু অংক বা ব্যাকরণ শেখানো মানুষ না।
শিক্ষক মানে এমন একজন,
যার কাছে ছাত্র নিরাপদ বোধ করে,
যার কাছে ছাত্র বলতে পারে—“স্যার, আমি ভয় পাচ্ছি।”
এখন যদি কোনো ছাত্র বলে,
“আমি সমকামী, আমাকে মারধর করা হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে”—
তখন শিক্ষক কী বলবে?
“তুমি ভুল মানুষ, তাই আমি দূরে থাকব”?
নাকি বলবে,
“তুমি আমার ছাত্র, তোমার নিরাপত্তা আমার দায়িত্ব”?
যারা বলে, শিক্ষক পাশে দাঁড়াতে পারবে না,
তারা আসলে বলছে—
কিছু ছাত্র মানুষ,
আর কিছু ছাত্র সমস্যা।
এটা শিক্ষা না, এটা বাছাই করা মানবতা।
আইনের দিক থেকে দেখলেও বিষয়টা পরিষ্কার।
বাংলাদেশে কোনো আইনে লেখা নেই—
“সমকামী ছাত্রকে সাহায্য করা অপরাধ।”
কিন্তু সামাজিক চাপ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে,
যেন একজন শিক্ষক মানবিক হলে অপরাধী হয়ে যাবে।
এটাই ভয়ংকর।
কারণ শিক্ষক যদি ভয় পায়,
তাহলে ছাত্র যাবে কোথায়?
বাড়িতে বললে মার খাবে,
বন্ধুদের বললে হাসাহাসি হবে,
আর শিক্ষকের কাছেও গেলে যদি দরজা বন্ধ থাকে—
তাহলে ওই ছাত্রের সামনে থাকে শুধু নীরবতা আর ভয়।
আর এই ভয় থেকেই জন্ম নেয়
ড্রপআউট,
ডিপ্রেশন,
আত্মহত্যার চিন্তা।
এগুলো কি “নৈতিকতা রক্ষা”?
নাকি সামাজিক ব্যর্থতা?
অনেকে বলেন,
“শিক্ষক যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে সে সমকামিতা সমর্থন করছে।”
এটা ইচ্ছাকৃত ভুল ব্যাখ্যা।
একজন শিক্ষক যখন বুলিংয়ের শিকার ছাত্রকে রক্ষা করে,
তখন কি সে বুলিংকে সমর্থন করে?
একজন শিক্ষক যখন দরিদ্র ছাত্রকে সাহায্য করে,
তখন কি সে দারিদ্র্যকে সমর্থন করে?
না।
সে মানুষকে সমর্থন করে।
শিক্ষকের কাজ বিচার করা না।
শিক্ষকের কাজ আগলে রাখা।
ধর্মের কথা তুলে আনা হয়।
কিন্তু কোনো ধর্মই বলে না—
অপমান করো,
পেটাও,
একঘরে করো।
যদি কোনো ছাত্রের পরিচয়ের কারণে
সে ক্লাসে নিরাপদ না থাকে,
তাহলে শিক্ষক চুপ থাকলে
সে চুপচাপ অন্যায়ের পক্ষ নেয়।
আর ইতিহাস বলে,
শিক্ষকের নীরবতা সবচেয়ে ভয়ংকর শিক্ষা দেয়।
একজন শিক্ষক যদি বলে,
“এই ছাত্রকে হয়রানি করা যাবে না”,
“এই ছাত্রকে মানুষ হিসেবে দেখা হবে”—
তাহলে সে কোনো আন্দোলন করছে না।
সে তার পেশার ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করছে।
কারণ শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় পাশ করানো না।
শিক্ষা মানে মানুষ বানানো।
আর মানুষ বানাতে হলে
শিখাতে হয়—
ভিন্ন মানুষও মানুষ।
শিক্ষক হিসেবে সমকামী ছাত্রের পাশে দাঁড়ানো মানে
তার যৌন পরিচয় প্রচার করা না।
মানে তাকে মার খাওয়া থেকে বাঁচানো।
মানে তাকে অপমান থেকে রক্ষা করা।
মানে তাকে বোঝানো—
“তুমি একা না।”
যে সমাজে শিক্ষকও ভয় পায়,
সেই সমাজে ছাত্ররা কী শিখবে?
ভয়?
নাকি ন্যায়?
প্রশ্নটা তাই বদলাতে হবে—
শিক্ষক হিসেবে কি সমকামী ছাত্রের পাশে থাকতে নেই?
না।
প্রশ্নটা হলো—
শিক্ষক কি এখনো মানুষ হয়ে থাকার অনুমতি পাবে,
নাকি কেবল নীরব দর্শক হয়ে থাকবে?
যেদিন শিক্ষকরা ভয়ের চেয়ে দায়িত্বকে বড় ভাববে,
সেদিনই স্কুল নিরাপদ হবে—
শুধু সমকামী ছাত্রের জন্য না,
সব ছাত্রের জন্য।