ক্ষুরধার বক্তব্য: নাচ–গান নিষিদ্ধকারীরা মানবতার সবচেয়ে ছোট মানুষ

Share

বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র কাঠামো আজ এক সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে আধুনিকতা, নাগরিক অধিকার, বৈচিত্র্য ও মুক্তচিন্তার দিকে অগ্রসর হওয়া একটি তরুণ প্রজন্ম; অন্যদিকে দেশকে অতীতের অন্ধকার বর্বরতার দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা একদল মৌলবাদী শক্তি।

মৌলবাদীরা কী চায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দেখি, তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে এমন সব লক্ষ্য, যা রাষ্ট্রের সংবিধান, মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও আধুনিক সভ্যতার ধারার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

১. সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ: নাচ–গান নিষিদ্ধের স্বপ্ন

মৌলবাদীদের প্রথম লক্ষ্যই হচ্ছে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা। নাচ, গান, নাটক, শিল্প—এসব মানবসভ্যতার মৌলিক অভিব্যক্তি; এগুলো মানুষকে উদার করে, মুক্ত করে, বহুত্ববাদী করে তোলে।
কিন্তু মৌলবাদী গোষ্ঠী চায় ঠিক উল্টোটা।
তারা এমন একটি সমাজ গড়তে চায় যেখানে শিল্প–সংস্কৃতি থাকবে “নিষিদ্ধ”, কারণ সংস্কৃতি মানুষের ভিতর প্রশ্ন জাগায়, সচেতনতা তৈরি করে, আর সচেতন মানুষকে দমন করা কঠিন।

২. নারীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারণা

এই গোষ্ঠীর আরেকটি প্রকাশ্য লক্ষ্য হলো বহুবিবাহকে সামাজিকভাবে আরও বৈধতা দেওয়া, যেন পুরুষের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় থাকে।
নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যক্তিস্বাধীনতা—এসবের বিরোধিতা তাদের দীর্ঘদিনের এজেন্ডা। বহুবিবাহকে “ধর্মীয় স্বাধীনতা” হিসেবে তুলে ধরা হলেও প্রকৃত অর্থে এটি নারীর সমানাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার একটি সামাজিক চক্রান্ত মাত্র।

৩. বৈচিত্র্যের প্রতি ঘৃণা: সমকামীদের হত্যার দাবি

বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে মানুষের জীবন ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু মৌলবাদীরা সেই অধিকারকে অস্বীকার করে বলে—সমকামী মানুষদের হত্যা করা উচিত।
এ ধরনের বক্তব্য শুধু বর্বরতাই নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনকে উপহাস করা এবং সহিংসতা legitimise করার প্রচেষ্টা।
যে সমাজে ভিন্নমতের মানুষ নিরাপদ নয়, সেই সমাজ কখনই সভ্যতার পথে এগোয় না।

৪. রাজনৈতিক ছায়াশক্তি: হেফাজত ইসলাম ও জামায়াত-শিবির

বাংলাদেশে মৌলবাদী রাজনীতির বড় দুই প্ল্যাটফর্ম হলো হেফাজত ইসলাম এবং জামায়াত–শিবির।
একটি সংগঠন ধর্মের ব্যাখ্যার নামে সমাজকে মধ্যযুগীয় কাঠামোয় ফেরত নিতে চায়, অন্যটি দেশের স্বাধীনতা বিরোধী পুরোনো রাজনৈতিক প্রজেক্টকে আজও বিভিন্ন রূপে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
তাদের লক্ষ্য একটাই—
গণতন্ত্রকে দুর্বল করে একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলা।

৫. দেশকে কোথায় নিতে চায় তারা?

মৌলবাদীদের লক্ষ্যকে এক লাইনে বলা যায়—
বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, মানবিক, বহুত্ববাদী জাতি থেকে সরিয়ে ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

তারা চায়—

শিল্প–সংস্কৃতি বন্ধ

নারীর স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ

ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণ

ভিন্ন যৌনতা–বিশ্বাস–মতাদর্শকে নির্মূল

গণতন্ত্রকে দুর্বল করে ধর্মীয় গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা

অর্থাৎ তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যা স্বাধীনতার মূল চেতনা—মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, বৈচিত্র্য—এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

৬. প্রতিরোধ কোথায়?

প্রতিরোধ আছে—
মানুষের মধ্যে, শিক্ষায়, যুক্তিতে, সাংস্কৃতিক চর্চায় এবং গণতান্ত্রিক চেতনায়।
যতদিন নাগরিকরা প্রশ্ন করতে শিখবে, মত প্রকাশের সাহস রাখবে, শিল্প–সংস্কৃতিকে ধরে রাখবে, ততদিন মৌলবাদীরা এই দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারবে না।
বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগণ এখনও শান্তি, প্রগতিশীলতা ও মানবিকতার পক্ষে। এটা মৌলবাদীদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—আর আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।