বাংলাদেশে সমকামী মানুষ নিরাপদ কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকাতে হয়। বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়টা দেখলে বোঝা যায়, পরিস্থিতি উন্নতির দিকে নয়, বরং আরও গোপন আর আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইনের অবস্থান অপরিবর্তিত।
এই পাঁচ বছরেও দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল হয়নি। অর্থাৎ রাষ্ট্র এখনো সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবেই দেখে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই আইন খুব কম প্রয়োগ হলেও এটি পুলিশের হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং সামাজিক হুমকির আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২০২০–২০২১: “গে বিয়ে” অভিযানের নামে গ্রেপ্তার
২০২০ ও ২০২১ সালে ঢাকার আশপাশের কয়েকটি এলাকায় পুলিশ “গে বিয়ে” আয়োজনের অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে আটক করে। কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় এমন অভিযানের খবর গণমাধ্যমে আসে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মাদক, পর্নোগ্রাফি বা প্রতারণার মতো বিকল্প মামলা দেওয়া হয়, কিন্তু সামাজিকভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায় “সমকামী” হিসেবে। এতে তাদের পরিবার, চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে।
২০২২: অনলাইনেও নিরাপত্তা নেই
২০২২ সালে একাধিকবার সমকামীদের ব্যবহৃত কিছু ডেটিং অ্যাপ ও গ্রুপ নজরদারির মধ্যে পড়ে। অনলাইনে পরিচয়ের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল ও মারধরের অভিযোগ উঠে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সমকামী মানুষের জন্য অনলাইন স্পেসও আর নিরাপদ থাকেনি। বাস্তবে তারা অফলাইন ও অনলাইন—দুই দিক থেকেই ঝুঁকিতে পড়ে।
২০২৩: মতপ্রকাশের জায়গা আরও সংকুচিত
২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন চালু হলেও এলজিবিটি বিষয়ে কনটেন্ট প্রকাশ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিছু অ্যাক্টিভিস্ট জানান, ফেসবুক পোস্ট, কবিতা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। প্রকাশ্যে “আমরা আছি” বলার সুযোগ প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
২০২৪: পরিবারই হয়ে ওঠে প্রথম শত্রু
২০২৪ সালে বিভিন্ন এনজিওর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সমকামী তরুণদের বড় অংশ পরিবার থেকে চাপের মুখে জোরপূর্বক বিয়েতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল কেড়ে নেওয়া, ঘরে আটকে রাখা বা ধর্মীয় চিকিৎসার নামে নির্যাতনের ঘটনাও সামনে আসে। অর্থাৎ ঝুঁকি শুধু রাষ্ট্র বা উগ্র গোষ্ঠী থেকে নয়, ঘরের ভেতর থেকেও আসছে।
২০২৫: দৃশ্যমানতা নেই, নিরাপত্তাও নেই
২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কোনো প্রকাশ্য এলজিবিটি সংগঠন বা ইভেন্ট নেই। প্রাইড মার্চ নেই, অধিকারভিত্তিক প্রকাশনা নেই, এমনকি প্রকাশ্য আলোচনাও নেই। এই অনুপস্থিতি কোনো স্বাভাবিক অবস্থা নয়; এটি ভয় থেকে তৈরি হওয়া শূন্যতা।
এই পাঁচ বছরে রাষ্ট্রের অবস্থান বদলায়নি, সমাজের মনোভাবও মৌলিকভাবে বদলায়নি। বরং বদলেছে কৌশল—
আগে হত্যা করা হতো, এখন নীরব করা হয়।
আগে নিষিদ্ধ করা হতো, এখন অদৃশ্য করা হয়।
তাহলে কি সমকামীরা নিরাপদ?
আইনের দিক থেকে: না।
রাষ্ট্রীয় নীতিতে: না।
সামাজিক বাস্তবতায়: না।
প্রকাশ্যে পরিচয়ের ক্ষেত্রে: একেবারেই না।
তারা টিকে থাকে কেবল তখনই, যখন তারা লুকিয়ে থাকে।
যখন তারা নিজের পরিচয় গোপন করে।
যখন তারা “স্বাভাবিক” সেজে বাঁচে।
কিন্তু এটাকে নিরাপত্তা বলা যায় না। এটাকে বলা যায় চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা।
অনেকে বলেন, “এটা আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না।” কিন্তু প্রশ্নটা সংস্কৃতির না, নাগরিক অধিকারের। সংবিধান যখন বলে সবাই সমান, তখন এক শ্রেণির মানুষকে শুধু পরিচয়ের কারণে ঝুঁকিতে রাখা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।
২০২০ থেকে ২০২৫—এই সময়টা দেখিয়ে দেয়,
সমস্যা সমকামিতা না,
সমস্যা আইন, রাষ্ট্রীয় নীতি আর সামাজিক মানসিকতার জোট।
বাংলাদেশে সমকামীরা কি নিরাপদ?
এই পাঁচ বছরের ঘটনাই উত্তর দেয়—না।
আর যতদিন মানুষকে লুকিয়ে বাঁচতে হবে,
ততদিন এই প্রশ্নের উত্তর বদলাবে না।