কুমিল্লায় সমকামীরা কি নিরাপদ? বাস্তবতা ও আতঙ্ক

Share

 

কুমিল্লা আলাদা শহর নয়, এটা বাংলাদেশেরই একটা বড় জেলা। তাই এখানে সমকামী (LGBTQ) মানুষ কেমন নিরাপত্তা পায়, সেটা পুরো দেশের বাস্তবতার একটা সংস্করণই। সরাসরি বলা ভালো—কুমিল্লা বা বাংলাদেশের আরেক কোন জেলার মতো, সমকামী মানুষ এখানে নিরাপদ নয়, অন্তত সেই নিরাপত্তা যা তারা নাগরিক হিসেবে পাওয়ার কথা।

সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো আইনি অবস্থা। বাংলাদেশে একই লিঙ্গের মধ্যে যৌন সম্পর্ককে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে colonial যুগের ‘ধারা ৩৭৭’—এর কারণে যুক্তরাজ্যের প্রাচীন এই আইন এখনো সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে। যদিও এই ধারা খুব বেশি প্রয়োগ হয় না, কিন্তু এটি সমকামীদের চারপাশে ভয় আর হুমকির আবহ তৈরি করে রাখে।

আইন দিয়ে যুদ্ধ না হলেও সমাজের চোখে বিচার শুরু হয়ে যায়। অধিকাংশ স্থানেই—ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা—সমকামী পরিচয়কে সামাজিকভাবে অসম্মান, অপবাদ বা নৈতিক অনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। পরিবার থেকে শুরু করে পাড়াপড়শি স্তরেও অবজ্ঞা বা চাপ লেখা পড়া ঘটতে পারে। এর ফলে অনেকে নিজের পরিচয় গোপন রাখে, ভৌগোলিক নিরাপত্তা না পেলেও মানসিক নিরাপত্তা থাকে না।

আরও ভয়ানক দিক হলো: সাম্প্রতিক বছরের ঘটনা বলে দেয়, শুধু সামাজিক নিষেধ নয়, সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। সমকামী নির্যাতন, হুমকি, অপমান বা সহিংসতার ঘটনা বিভিন্ন সময়ে নজরে এসেছে, এবং এটি শুধু বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। কিছু বছর আগে ঢাকায় একটি সমকামী অধিকারকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, এবং ওই হত্যাকাণ্ড সাম্প্রদায়িক কঠোর নাগরিক গোষ্ঠীর উদ্দেশে প্রকাশ্য হুমকির মধ্য দিয়ে ঘটেছিল।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ছোট বা মধ্যম শহরগুলো—যেমন কুমিল্লা—আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি থাকে। কারণ বড় শহরের তুলনায় সেখানে সামাজিক সহিষ্ণুতার চাপ কম, পরিবার ও পাড়াপড়শির নজরদারি বেশি, এবং গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন। অনেক সময় ছেঁড়া হুমকি, অপপ্রচার বা সামাজিক বয়কটের ভয়েই লজ্জা, আত্মগোপন আর নির্জনতা বাড়ে।

এটা শুধু শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। মনের নিরাপত্তা, জীবিকার নিরাপত্তা, পরিবারে গ্রহণযোগ্যতার নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রেও আজ অবধি সমকামী মানুষ নিয়মিত ঝুঁকির মধ্যে আছে। জীবনের নানা স্তরে হেনস্থা, বাধা, বৈষম্য বা অপমানের প্রতিবেদন অনেক সংগঠনই তুলে ধরেছে, যদিও সব ঘটনাই সংবাদে যায় না বা সরকারি পর্যায়ে নথিভুক্ত হয় না।

তাই ‘নিরাপদ’ শব্দটা খুব হালকা করে ব্যবহার করা যায় না। নিরাপদ মানে কেউ হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হবে না—এটা এখানে প্রাথমিক স্তরেও নেই। কুমিল্লা বা দেশের অন্য অঞ্চলে সমকামী মানুষ প্রায়ই নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়, নৈতিক অপমান, চাকরির বৈষম্য, পরিবারে চাপ বা সামাজিক হুমকি এড়াতে চুপ থাকতে হয়—এটাকেই অনেকেই “বেঁচে থাকা” বলে নিয়েছে।

শেষে বলতে হয়, সমস্যাটা কোনো ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা—জেন্ডার, পরিচয় ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈষম্যের জটিলমিশ্র ফল। এবং যতদিন এই বাস্তব পরিস্থিতি গুলি খোলাখুলিভাবে আলোচিত হবে না, যতদিন আইনি ও সামাজিক সমমনা নীতি দেওয়া হবে না, ততদিন কুমিল্লা বা দেশের অন্য জেলা-শহরগুলোতে সমকামী মানুষ পুরোপুরি নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হবে না।