“নিরাপদ” শব্দটার মানে কী?
রাস্তায় হাঁটতে পারা?
পরিচয় লুকাতে না হওয়া?
ভয় ছাড়া কথা বলতে পারা?
নাকি শুধু বেঁচে থাকা?
এই প্রশ্নগুলো সামনে রাখলে কুমিল্লা শহরের বাস্তবতা খুব পরিষ্কার হয়ে যায়—সমকামী মানুষ এখানে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নয়। তারা টিকে থাকে, কিন্তু নিরাপদ থাকে না।
কুমিল্লা কোনো বিচ্ছিন্ন শহর না। এটি বাংলাদেশেরই একটি জেলা শহর। এখানকার সামাজিক কাঠামো পরিবারকেন্দ্রিক, ধর্মীয় অনুশাসন শক্ত, আর “ভিন্নতা” সহজে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি দুর্বল। এই পরিবেশে সমকামী পরিচয় মানে নিজেকে সারাক্ষণ পাহারা দেওয়া। কে দেখছে, কে শুনছে, কে সন্দেহ করছে—এই চিন্তা মাথায় নিয়ে চলতে হয়।
প্রথমেই আসে আইনের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা এখনো বহাল। এই আইনে সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে। যদিও এই ধারা নিয়মিত প্রয়োগ হয় না, কিন্তু এর উপস্থিতিই সমকামী মানুষকে দুর্বল করে রাখে। কারণ যেকোনো সময় এই আইনের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা যায়, পুলিশি হয়রানি করা যায়, সামাজিকভাবে হেয় করা যায়। আইন যখন তোমাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন সমাজও সেটাকেই ন্যায্য মনে করে।
এরপর আসে সামাজিক বাস্তবতা।
কুমিল্লার মতো শহরে মানুষ একে অপরকে চেনে। পরিবার, পাড়া, আত্মীয়—সবকিছু মিলিয়ে একটি শক্ত নজরদারির বলয় তৈরি হয়। এখানে কেউ “ভিন্ন” হলে সেটা দ্রুত আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সমকামী পরিচয় জানাজানি হলে ফল হতে পারে—
পরিবারের চাপ,
জোর করে বিয়ে দেওয়া,
ঘরে আটকে রাখা,
মোবাইল কেড়ে নেওয়া,
অপমান,
এমনকি মারধর।
এই ঘটনাগুলো খুব কমই প্রকাশ্যে আসে। কারণ ভুক্তভোগী জানে—বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
শহরের ছোট পরিসর আরেকটা সমস্যা তৈরি করে।
ঢাকায় হয়তো কোথাও হারিয়ে যাওয়া যায়,
কুমিল্লায় সেটা কঠিন।
একই বাজার, একই কলেজ, একই বাসস্ট্যান্ড, একই পাড়া।
পরিচয় ফাঁস হলে লুকানোর জায়গা কমে যায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো “নিরাপত্তার ভান”।
অনেকে বলে, “কুমিল্লায় তো এমন কিছু হয় না।”
কিন্তু বাস্তবে হয় অন্যভাবে—
মানুষকে মারার দরকার পড়ে না,
মানুষকে চুপ করিয়ে দিলেই হয়।
আগে হত্যা হতো,
এখন অদৃশ্য করা হয়।
সমকামী মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিক জীবন থেকে সরে যায়।
সে আর অনুষ্ঠানে যায় না,
বন্ধুদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলে না,
নিজের মতো করে হাসে না।
এই অবস্থা কোনো নিরাপত্তা নয়, এটা সামাজিক বন্দিত্ব।
অনলাইনে পরিস্থিতি ভালো নয়।
ডেটিং অ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয়ের ফাঁদ পেতে অনেক সময় ব্ল্যাকমেইল করা হয়।
“তোমার ছবি আছে”,
“পরিচয় ফাঁস করে দেব”—
এই হুমকি দিয়ে টাকা নেওয়ার ঘটনা একেবারে বিরল না।
সবচেয়ে কঠিন জায়গা পরিবার।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারই প্রথম প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
কারণ তারা এটাকে অসুখ, পাপ বা লজ্জা মনে করে।
ফলে সমকামী তরুণ বা তরুণী নিজের বাড়িতেই নিরাপদ থাকে না।
এটা শুধু শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়।
মানসিক নিরাপত্তাও নেই।
নিজের পরিচয় লুকিয়ে বাঁচা মানে প্রতিদিন নিজেকে অস্বীকার করা।
এই চাপ থেকে ডিপ্রেশন, আত্মহত্যার চিন্তা, মাদকাসক্তি—এসব ঝুঁকি বাড়ে।
তাহলে প্রশ্ন আসে—
কুমিল্লায় সমকামীরা কি নিরাপদ?
আইনের দিক থেকে—না।
সামাজিকভাবে—না।
পরিবারের ভেতরে—প্রায়শই না।
প্রকাশ্যে পরিচয় দিলে—একেবারেই না।
তারা নিরাপদ থাকে কেবল তখনই,
যখন তারা অদৃশ্য থাকে।
যখন তারা “স্বাভাবিক” সেজে থাকে।
যখন তারা নিজের জীবন নিজের বলে স্বীকার করে না।
কিন্তু এই অবস্থাকে নিরাপত্তা বলা যায় না।
এটা বলা যায়—বাঁচার কৌশল।
অনেকে বলেন, “এটা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না।”
কিন্তু আসলে প্রশ্নটা সংস্কৃতির না।
প্রশ্নটা নাগরিক অধিকারের।
সংবিধান বলছে, সব নাগরিক সমান।
কিন্তু বাস্তবে কিছু নাগরিককে বলা হচ্ছে—
তুমি চুপ থাকো,
তুমি লুকিয়ে থাকো,
তুমি নিজের মতো হও না।
এটা কোনো আলাদা শহরের সমস্যা না।
কুমিল্লা শুধু সেই বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি।
যেদিন কুমিল্লার কোনো তরুণ বলতে পারবে—
“আমি যেমন, তেমনই আমি”—
আর তার চাকরি যাবে না,
পরিবার তাকে ত্যাগ করবে না,
পাড়ার লোক তাকে তাড়া করবে না—
সেদিন বলা যাবে, কুমিল্লা নিরাপদ।
আজ বলা যায় না।
কারণ নিরাপত্তা মানে শুধু বেঁচে থাকা না।
নিরাপত্তা মানে মানুষ হয়ে বাঁচা।
আর এখনো কুমিল্লায় সমকামী মানুষ
মানুষ হয়ে বাঁচতে পারে না,
শুধু টিকে থাকে।